বাংলাদেশের শ্রমবাজার: ইতিহাস, বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ রূপান্তরের রূপরেখা

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো এর বিপুল শ্রমশক্তি। কৃষিপ্রধান অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে শিল্প ও সেবাখাতনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পেছনে এ দেশের সাধারণ মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছে। শ্রমবাজার কেবল শ্রম কেনাবেচার কোনো সাধারণ স্থান নয়, বরং এটি একটি দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, জীবনযাত্রার মান, দারিদ্র্য বিমোচন এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার প্রধান নির্ধারক। নিচে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সামগ্রিক রূপরেখা, এর ঐতিহাসিক বিবর্তন, বর্তমান চিত্র এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

শ্রমবাজারের পরিচয়

শ্রমবাজার হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যেখানে শ্রমিকরা তাদের শারীরিক ও মানসিক শ্রম বিক্রি করে এবং নিয়োগকর্তা বা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই শ্রম ক্রয় করে। এই বিনিময়ের মাধ্যমে শ্রমিকরা নির্দিষ্ট বেতন বা মজুরি লাভ করে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করে। শ্রমবাজারে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করে, যার মধ্যে দক্ষ, অদক্ষ, আধা-দক্ষ, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, নারী ও পুরুষ সবাই অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ অর্থে, শ্রমবাজার বলতে শ্রমের চাহিদা এবং শ্রমের সরবরাহের মধ্যকার মিথস্ক্রিয়াকে বোঝায়, যেখানে এক পক্ষ শ্রম দেয় এবং অন্য পক্ষ অর্থের বিনিময়ে তা গ্রহণ করে। তবে বিস্তারিত অর্থে শ্রমবাজার কেবল শ্রমের সাধারণ কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি জটিল আর্থ-সামাজিক ও আইনগত ব্যবস্থা, যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, সরকারি শ্রম আইন, ট্রেড ইউনিয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

একটি পূর্ণাঙ্গ শ্রমবাজার মূলত পাঁচটি মৌলিক উপাদানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। প্রথমত, শ্রমিক, যিনি তার শারীরিক ও মেধাশক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নেন এবং এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক পান। দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠান বা নিয়োগকর্তা, যা কোনো ব্যক্তি, কারখানা, কর্পোরেট সংস্থা বা সরকারি দপ্তর হতে পারে, যেখানে শ্রমিকরা কাজ করেন। তৃতীয়ত, বেতন বা মজুরি, যা শ্রমিকের সময়ের ও কাজের বিনিময়ে আর্থিক বা অনার্থিক সুবিধা হিসেবে প্রদান করা হয়। চতুর্থত, শ্রমের চাহিদা, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের গতির ওপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানগুলো কর্তৃক নির্ধারিত হয়। পঞ্চমত, শ্রমের সরবরাহ, যা একটি দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার আকার, গড় বয়স এবং কারিগরি দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে বাজারে উপলব্ধ থাকে।

অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী শ্রমবাজারের কাঠামো বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। নিখুঁত প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে অসংখ্য শ্রমিক এবং অসংখ্য নিয়োগকর্তা উপস্থিত থাকে। এই বাজারে কোনো একক শ্রমিক বা একক প্রতিষ্ঠান মজুরি নির্ধারণে একচেটিয়া প্রভাব ফেলতে পারে না, বরং বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের স্বাভাবিক নিয়মেই বেতন নির্ধারিত হয়। অন্যদিকে, একাধিপত্যমূলক শ্রমবাজারে (Monopsony) নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে বা খাতে শুধুমাত্র একটি বড় প্রতিষ্ঠান নিয়োগকর্তা হিসেবে থাকে এবং বিপরীতে অনেক শ্রমিক কাজ পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করে। এই পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানটি মজুরি নির্ধারণে পূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করে এবং অনেক সময় শ্রমিকরা কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হয়। আবার একাধিপত্যমূলক প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে বাজারে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান এবং বিপুল সংখ্যক শ্রমিক থাকে। এখানে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাজের পরিবেশ, ব্র্যান্ড ভ্যালু এবং বিশেষ সুবিধার কারণে মজুরি নির্ধারণে কিছুটা নিজস্ব প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

একটি দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিতে শ্রমবাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষ ও সুসংগঠিত শ্রমবাজার সরাসরি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে, কারণ প্রশিক্ষিত কর্মীরা কম সময়ে অধিক মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করতে পারে। এটি দেশের মানবসম্পদ ও মূলধনের সঠিক বরাদ্দ নিশ্চিত করে, যাতে কোনো খাতেই শ্রমের অপচয় না হয়। সুষ্ঠু শ্রমবাজারের মাধ্যমে জাতীয় আয়ের সুষম বণ্টন ঘটে, যা ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনে। সর্বোপরি, সাধারণ মানুষের জন্য নিয়মিত আয়ের পথ তৈরি করে শ্রমবাজার দারিদ্র্য বিমোচনে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।

শ্রমবাজারের প্রধান কার্যাবলী কেবল চাকরি দেওয়া-নেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রথম ও প্রধান কাজ হলো দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং শ্রমের চাহিদা ও সরবরাহের সমন্বয় ঘটিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মজুরি নির্ধারণ করা। আধুনিক শ্রমবাজার কর্মীদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার সুযোগ তৈরি করে দেয়। পাশাপাশি, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা আকস্মিক বেকারত্বের মতো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য বীমা, পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এর অন্যতম কাজ। শ্রমবাজার একদিকে যেমন দক্ষ জনশক্তি সরবরাহের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখে, তেমনি সময়োপযোগী শ্রম আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের অধিকার রক্ষা করে। এছাড়া শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন এবং সমাজে অপরাধপ্রবণতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শ্রমবাজার নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।

তবে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বর্তমানে নানা কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রকট সমস্যা হলো বেকারত্ব, বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ সমাজের মধ্যে বেকারত্বের হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দ্বিতীয় বড় সমস্যা হলো নিম্ন মজুরি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির তুলনায় এ দেশের শ্রমিকদের মজুরি অনেক কম, যা তাদের জীবনযাত্রার মানকে নিচে নামিয়ে রাখছে। তৃতীয়ত, আমাদের দেশে দক্ষ জনশক্তির তীব্র অভাব রয়েছে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে শিল্পখাতের চাহিদার মিল না থাকায় কারখানাগুলো দক্ষ কর্মী পায় না, অথচ লাখ লাখ তরুণ কাজের আশায় ঘুরে বেড়ায়। চতুর্থত, জনসংখ্যার অনুপাতে দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ কম সৃষ্টি হচ্ছে। পঞ্চমত, অনেক শিল্পকারখানায় এখনো অনিরাপদ কর্মপরিবেশ বিরাজমান, অগ্নিকাণ্ড বা ভবন ধসের মতো দুর্ঘটনায় প্রায়ই শ্রমিকরা হতাহত হন। ষষ্ঠত, আইন থাকা সত্ত্বেও দারিদ্র্যের কারণে অনানুষ্ঠানিক খাতে শিশুশ্রম এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, যা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। সপ্তমত, নারী শ্রমিকদের শোষণ ও বৈষম্য শ্রমবাজারের আরেকটি কালো দিক, অনেক ক্ষেত্রেই নারীদের পুরুষের সমান কাজের জন্য কম মজুরি দেওয়া হয় এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। অষ্টমত, বিদ্যমান শ্রমিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা ও ছুটি থেকে বঞ্চিত হন। নবমত, অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক উভয় শ্রমবাজারেই দালালদের দৌরাত্ম্য চরমে, যারা চাকরি দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। দশমত, শ্রমিক সংগঠনগুলোর দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তির কারণে শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ইতিহাস

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময়, যা মূলত তিনটি প্রধান কালপর্বে বিভক্ত: প্রাচীন ও মধ্যযুগ, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের ঔপনিবেশিক যুগ এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পরবর্তী যুগ। প্রাচীনকালে বাংলার শ্রমবাজার ছিল সম্পূর্ণরূপে গ্রামীণ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। তখন প্রচলিত অর্থে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজার বা নির্দিষ্ট বেতনভুক্ত শ্রমিক শ্রেণি ছিল না। সমাজের কাঠামো ছিল পেশাভিত্তিক এবং বংশানুক্রমিক। কৃষকরা জমিতে ফসল ফলাত, আর কামার, কুমার, তাঁতি, ছুতার ও জেলেরা তাদের উৎপাদিত পণ্য ও সেবা গ্রামের মানুষের কাছে বিনিময় প্রথার (Barter System) মাধ্যমে সরবরাহ করত। মধ্যযুগে, বিশেষ করে মুঘল আমলে বাংলায় মসলিন ও রেশম শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ঢাকা, সোনারগাঁও এবং মুর্শিদাবাদকে কেন্দ্র করে উন্নত তাঁতশিল্প গড়ে ওঠে, যেখানে হাজার হাজার দক্ষ কারিগর কাজ করতেন। এই সময়েই প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় ও বণিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় দাদন প্রথার মাধ্যমে কারিগরদের শ্রম ক্রয়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখা যায়।

১৭৫৭ সালে পলাশী যুদ্ধের পর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শ্রমবাজারের কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। ব্রিটিশদের অসম করনীতি এবং ইংল্যান্ডের শিল্পবিপ্লবের কলে তৈরি সস্তা কাপড়ের প্রভাবে বাংলার বিশ্বখ্যাত তাঁত ও কুটির শিল্প ধ্বংস হয়ে যায়। ফলে লাখ লাখ দক্ষ কারিগর বেকার হয়ে পুনরায় কৃষিকাজে ফিরে যেতে বাধ্য হয়, যা কৃষির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ব্রিটিশরা তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থে এ অঞ্চলে রেলপথ স্থাপন, চা বাগান তৈরি এবং পাটকল স্থাপন শুরু করে। এর ফলে বাংলায় প্রথমবারের মতো আধুনিক মজুরিভিত্তিক শিল্প শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। আসাম ও সিলেটের চা বাগানগুলোতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দরিদ্র শ্রমিকদের চুক্তিভিত্তিক বা ‘গিরমিটিয়া’ শ্রমিক হিসেবে নিয়ে আসা হয়, যাদের জীবন ছিল প্রায় দাসত্বের সমান। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান আমলে আদমজী পাটকলসহ বেশ কিছু বৃহৎ শিল্পকারখানা গড়ে উঠলেও, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে এ অঞ্চলের শ্রমবাজারের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ ঘটেনি। সে সময় কারখানাগুলোর মালিকানা ছিল মূলত অবাঙালিদের হাতে এবং বাঙালি শ্রমিকরা চরম মজুরি বৈষম্যের শিকার হতো।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের শ্রমবাজার এক নতুন যুগে প্রবেশ করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শুরুতে কলকারখানাগুলো জাতীয়করণ করা হলেও সত্তরের দশকের শেষভাগে আবার বেসরকারি খাতের বিকাশ ঘটতে থাকে। আশির দশকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে দুটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটে: একদিকে দেশে তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) যাত্রা শুরু হয়, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশি কর্মীদের অভিবাসন বা শ্রম রপ্তানি ব্যাপক আকার ধারণ করে। তৈরি পোশাক শিল্প গ্রামবাংলার লাখ লাখ দরিদ্র ও নিরক্ষর নারীকে ঘরের বাইরে এনে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমবাজারের সাথে যুক্ত করে, যা দেশের আর্থ-সামাজিক ইতিহাসে এক নীরব বিপ্লব ঘটায়। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে পোশাক শিল্পের পাশাপাশি ওষুধ শিল্প, আবাসন, টেলিযোগাযোগ, ব্যাংকিং এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের প্রসারের ফলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বহুমুখী রূপ লাভ করেছে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বর্তমান অবস্থা

বর্তমানে বাংলাদেশ তার জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ (Demographic Dividend) অতিক্রম করছে, যার অর্থ হলো দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশই কর্মক্ষম। বর্তমানে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে কর্মক্ষম জনসংখ্যার (১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব) আকার প্রায় ৭ কোটি ৩০ লক্ষের বেশি। প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লক্ষ নতুন মুখ এই শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। তবে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণের দিক থেকে বিচার করলে শ্রমবাজারে পুরুষের অংশগ্রহণ নারীর তুলনায় অনেক বেশি। যদিও গত দুই দশকে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪২ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, তবুও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং গৃহস্থালি কাজের অমূল্যায়িত চাপের কারণে বিপুল সংখ্যক নারী এখনো মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রয়ে গেছেন।

কর্মসংস্থানের খাতওয়ারী চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখনো প্রধানত তিনটি খাতে বিভক্ত: কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাত। ঐতিহাসিকভাবে কৃষিই ছিল কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস, এবং এখনো দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির সাথে যুক্ত। তবে কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ এবং জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় এই খাতে কর্মসংস্থানের হার ধীরে ধীরে কমছে। বিপরীতে শিল্প খাতে, বিশেষ করে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া, নির্মাণ এবং হালকা প্রকৌশল খাতে প্রায় ২০ শতাংশের বেশি শ্রমিক কাজ করছে। সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বাড়ছে সেবা খাত, যেখানে পরিবহন, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ব্যাংকিং, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ নিয়োজিত রয়েছে। তবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অনানুষ্ঠানিক বা ইনফরমাল (Informal) প্রকৃতি। দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে কাজের কোনো লিখিত চুক্তি নেই, নেই কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা সামাজিক সুরক্ষার নিশ্চয়তা।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে মজুরি ও আয়ের কাঠামোতে ব্যাপক অসমতা পরিলক্ষিত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক খাতে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি কাঠামো থাকলেও অনানুষ্ঠানিক খাতে মজুরি নির্ধারিত হয় সম্পূর্ণরূপে মৌখিক সমঝোতা এবং তাৎক্ষণিক চাহিদার ভিত্তিতে। তৈরি পোশাক শিল্পসহ কয়েকটি খাতে শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে মজুরি বৃদ্ধি করা হলেও, তা বর্তমান মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় যথেষ্ট নয়। গ্রামাঞ্চলের কৃষি শ্রমিকদের আয় মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে তাদের আয় মারাত্মকভাবে কমে যায়। এছাড়া নারী ও পুরুষের মজুরির ক্ষেত্রেও স্পষ্ট ব্যবধান রয়েছে, বিশেষ করে কৃষি ও নির্মাণ খাতে নারীরা পুরুষের সমান পরিশ্রম করেও তুলনামূলক কম মজুরি পান।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো এর আন্তর্জাতিকীকরণ বা বৈদেশিক কর্মসংস্থান। বর্তমানে বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশে প্রায় ১ কোটি ৪০ লক্ষের বেশি বাংলাদেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, কাতার, কুয়েত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর হলো বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রধান গন্তব্য। এই প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রধান উৎস এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তবে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া কর্মীদের সিংহভাগই স্বল্পশিক্ষিত ও অদক্ষ শ্রমিক, যার ফলে তারা অন্যান্য দেশের দক্ষ কর্মীদের তুলনায় অনেক কম বেতন পান এবং প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে দক্ষ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মী পাঠানোর নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সমস্যা ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সমস্যাগুলো অত্যন্ত গভীর ও বহুমাত্রিক। প্রধান সমস্যা হলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে শ্রমবাজারের চাহিদার চরম অসামঞ্জস্যতা (Skills Mismatch)। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলো থেকে প্রতি বছর লাখ লাখ শিক্ষার্থী সাধারণ শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে বের হচ্ছে, কিন্তু শিল্পকারখানা ও আধুনিক কর্পোরেট খাতে যে ধরণের কারিগরি, প্রযুক্তিগত ও যোগাযোগ দক্ষতার প্রয়োজন, তা তাদের অনেকেরই নেই। ফলে একদিকে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতের উচ্চপদে বিদেশি নাগরিকদের নিয়োগ দিতে হচ্ছে, যার মাধ্যমে দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে চলে যাচ্ছে। এছাড়া প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব বা ছদ্মবেশী বেকারত্ব (Disguised Unemployment) কৃষি খাতের একটি বড় সমস্যা, যেখানে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মানুষ একই জমিতে কাজ করছে কিন্তু উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না।

শ্রমবাজারের আরেকটি বড় সংকট হলো কাজের শোভন পরিবেশের (Decent Work) অভাব। অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুল সংখ্যক শ্রমিক, যেমন রিকশাচালক, দিনমজুর, গৃহকর্মী ও পরিবহন শ্রমিকরা কোনো ধরণের শ্রম আইনের সুরক্ষা পান না। অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনায় পড়লে তাদের আয়ের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। আবার বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী ও রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দৌরাত্ম্যের কারণে অভিবাসন ব্যয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি। একজন কর্মীকে বিদেশে যেতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হয়, অনেক সময় বছরের পর বছর কাজ করেও তিনি সেই টাকা তুলতে পারেন না, উপরন্তু বিদেশে গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পাওয়া এবং আইনি জটিলতায় পড়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এতসব সমস্যার মাঝেও বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সম্ভাবনা আকাশচুম্বী। আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। যখন জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ইউরোপের উন্নত দেশগুলো প্রবীণ জনসংখ্যার ভারে ন্যুব্জ এবং তীব্র শ্রমিক সংকটে ভুগছে, তখন বাংলাদেশে রয়েছে কোটি কোটি কর্মক্ষম তরুণ। এই তরুণদের যদি সঠিক কারিগরি প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশ বিশ্ব শ্রমবাজারের প্রধান যোগানদাতায় পরিণত হতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং খাতে ইতিমধ্যে বাংলাদেশের তরুণরা নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। ঘরে বসেই হাজার হাজার তরুণ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে।

এছাড়া দেশে নির্মাণাধীন ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (Special Economic Zones) পুরোপুরি চালু হলে সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রায় ১ কোটিরও বেশি মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরেও চামড়াজাত পণ্য, জাহাজ নির্মাণ শিল্প, ওষুধ শিল্প, হালকা প্রকৌশল এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার যদি আরও বাড়ানো যায় এবং তাদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (GDP) বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ

বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও টেকসই করতে হলে একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এর জন্য প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হতে হবে শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার। প্রচলিত তাত্ত্বিক শিক্ষার পরিবর্তে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে (TVET) মূলধারায় নিয়ে আসতে হবে। স্কুল ও কলেজ পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখানো, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, বিদেশি ভাষা শিক্ষা এবং শিল্পকারখানার আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে এবং শিল্পখাতের প্রকৃত চাহিদা নিরূপণ করে সেই অনুযায়ী পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে। একই সাথে কৃষি খাতের আধুনিকায়ন এবং গ্রামীণ পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামেই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে কাজের সন্ধানে মানুষের ঢাকামুখী স্রোত কমে আসে।

শ্রমবাজারের উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রণমূলক। সরকারকে একটি শ্রমবান্ধব ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, শ্রম আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিটি কারখানায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দালালদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বল্প খরচে এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বিদেশে কর্মী পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। প্রবাসে গমনেচ্ছু কর্মীদের সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা ও কাজের ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে পাঠাতে হবে এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে শ্রমিকদের আইনি সহায়তা প্রদানে আরও সক্রিয় হতে হবে। তৃতীয়ত, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের একটি ডাটাবেজের আওতায় এনে তাদের জন্য সর্বজনীন পেনশন স্কিম এবং স্বাস্থ্যবীমার মতো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। চতুর্থত, নতুন উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্যে তরুণদের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে জামানতবিহীন ঋণ প্রদান করতে হবে, যাতে তারা চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হতে পারে।

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ভূমিকাও এখানে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের মোট কর্মসংস্থানের সিংহভাগই সৃষ্টি করে বেসরকারি খাত। বেসরকারি শিল্পমালিকদের কেবল মুনাফা অর্জনের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে শ্রমিকদের কল্যাণের দিকে নজর দিতে হবে। শ্রমিকদের প্রতিষ্ঠানের বোঝা না ভেবে অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারখানাগুলোতে নিজস্ব উদ্যোগে অন-দ্য-জব ট্রেনিং (On-the-job training) বা কর্মকালীন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যা শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়াবে এবং দিনশেষে প্রতিষ্ঠানেরই লাভ হবে। নারী কর্মীদের কাজের সুবিধার্থে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার বা শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র স্থাপন, নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি সংযোগ (Industry-Academia Collaboration) স্থাপন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চলাকালীন কারখানায় ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পায় এবং পাস করার সাথে সাথেই কাজে যোগ দিতে পারে।

শ্রমবাজারের নীতি ও প্রবিধান

একটি সুশৃঙ্খল শ্রমবাজার পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি ও আইনগত প্রবিধান থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশে শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের মূল ভিত্তি হলো ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬’ (যা পরবর্তীতে ২০১৩ ও ২০১৮ সালে সংশোধিত হয়েছে) এবং ‘বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫’। সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই নীতিগুলো প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব পালন করে। শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের এই নীতিমালাগুলো মূলত নিয়োগ প্রক্রিয়া, কাজের চুক্তিপত্র, কর্মঘণ্টা, ছুটি এবং ছাঁটাই সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসে। আইন অনুযায়ী, কোনো শ্রমিককে নিয়োগের সময় বাধ্যতামূলকভাবে নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান করতে হয় এবং সাধারণ কর্মঘণ্টা দৈনিক ৮ ঘণ্টা (সপ্তাহে ৪৮ ঘণ্টা) নির্ধারণ করা আছে। অতিরিক্ত কাজের জন্য মূল বেতনের দ্বিগুণ হারে ওভারটাইম ভাতা প্রদানের বিধান রয়েছে, যা শ্রমবাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার ও কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষার জন্য সরকারের নীতি ও প্রবিধানগুলোতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি এবং তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের পর কারখানার ভবন ও অগ্নি-নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধিমালা অত্যন্ত কঠোর করা হয়েছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) নিয়মিতভাবে কারখানাগুলো পরিদর্শন করে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ করে। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য কারখানায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ খাবার পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিকের জন্য এমবিবিএস ডাক্তার রাখার বিধান রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে কোনো শ্রমিক দুর্ঘটনায় আহত হলে বা মৃত্যুবরণ করলে মালিকপক্ষ কর্তৃক নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া, শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন গঠন করার এবং যৌথ দরকষাকষির (Collective Bargaining) অধিকার আইনের মাধ্যমে স্বীকৃত, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) সনদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শ্রমবাজারে ন্যায্যতা, মানবিকতা ও সমতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার বেশ কিছু প্রগতিশীল নীতি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি, ২০১০’, যার মাধ্যমে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের শ্রমে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ১৮ বছরের কম বয়সীদের নিয়োগ সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করার জন্য শ্রম আইনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সমান মানের ও সমান প্রকৃতির কাজের জন্য নারী ও পুরুষ শ্রমিককে সমান মজুরি প্রদান করতে হবে; এখানে কোনো ধরণের বৈষম্য করা যাবে না। নারী শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য ১৬ সপ্তাহের সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি এবং গর্ভকালীন সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে বিরত রাখার বিধান রয়েছে। তাছাড়া, শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ‘নিম্নতম মজুরি বোর্ড’-এর মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পখাতের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়, যা শ্রমবাজারে অর্থনৈতিক ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

শ্রমবাজার তথ্য ও গবেষণা

যেকোনো দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য সঠিক ও হালনাগাদ শ্রমবাজার তথ্য ও গবেষণা (Labour Market Information and Research) অপরিহার্য। শ্রমবাজার তথ্যের সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ বলতে মূলত দেশের মোট জনসংখ্যা, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা, কর্মসংস্থানের হার, বেকারত্বের হার, খাতওয়ারী শ্রমিকের বণ্টন, গড় মজুরি, শ্রমের উৎপাদনশীলতা এবং ভবিষ্যৎ শ্রমের চাহিদা সংক্রান্ত পরিসংখ্যানগত উপাত্ত সংগ্রহ ও তার বৈজ্ঞানিক ব্যবচ্ছেদকে বোঝায়। বাংলাদেশে এই কাজটি প্রধানত করে থাকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)। বিবিএস নির্দিষ্ট সময় পর পর ‘শ্রমশক্তি জরিপ’ (Labour Force Survey – LFS) পরিচালনা করে, যা দেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের উৎস। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BIDS), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD), এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) শ্রমবাজারের বিভিন্ন দিক নিয়ে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে থাকে।

শ্রমবাজার গবেষণার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বহুমুখী। প্রথমত, সঠিক গবেষণার মাধ্যমেই সরকার বুঝতে পারে দেশের কোন অঞ্চলে বা কোন খাতে বেকারত্বের হার বেশি এবং কোথায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের জন্য আগামী পাঁচ বা দশ বছর পর কোন ধরণের কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজন হবে (যেমন- রোবটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, নাকি গ্রিন এনার্জি), তা কেবল শ্রমবাজার গবেষণার মাধ্যমেই পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব। এই পূর্বাভাসের ওপর ভিত্তি করেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর কারিকুলাম পরিবর্তন করা যায়। তৃতীয়ত, চাকরিপ্রার্থী তরুণরা গবেষণালব্ধ তথ্যের মাধ্যমে জানতে পারে কোন পেশায় কাজের সুযোগ ও বেতন বেশি, যা তাদের সঠিক ক্যারিয়ার গঠনে সাহায্য করে। চতুর্থত, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগ করার আগে সে দেশের শ্রমবাজারের প্রাপ্যতা, মজুরি হার এবং উৎপাদনশীলতার তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। সুতরাং, সঠিক তথ্য ও গবেষণা ছাড়া শ্রমবাজারের উন্নয়ন অনেকটা অন্ধকারে তীর ছোড়ার মতো।

শ্রমবাজার গবেষণার জন্য আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো পারিবারিক জরিপ (Household Survey) এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জরিপ (Enterprise Survey)। পারিবারিক জরিপের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নমুনা পরিবারগুলো থেকে সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে মানুষের কাজের অবস্থা ও আয়ের তথ্য নেওয়া হয়। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জরিপের মাধ্যমে কারখানা ও অফিসগুলোতে কী ধরণের কর্মীর সংকট রয়েছে এবং তাদের বেতন কাঠামো কেমন, তা জানা যায়। পরিমাণগত (Quantitative) তথ্যের পাশাপাশি গুণগত (Qualitative) গবেষণার জন্য ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন (FGD) এবং কি-ইনফরম্যান্ট ইন্টারভিউ (KII) কৌশল ব্যবহার করা হয়, যেখানে শ্রমিক নেতা, মালিকপক্ষ এবং নীতিনির্ধারকদের সাথে গভীর আলোচনার মাধ্যমে শ্রমবাজারের অন্তর্নিহিত সমস্যাগুলো তুলে আনা হয়। বর্তমানে ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে বিগ ডাটা অ্যানালিটিক্স (Big Data Analytics) এবং অনলাইন জব পোর্টালগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিকভাবে শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি বোঝার নতুন কৌশলও ব্যবহৃত হচ্ছে।

শ্রমবাজার সংস্থা ও সংগঠন

শ্রমবাজারের ভারসাম্য রক্ষা, নীতি বাস্তবায়ন এবং শিল্পসম্পর্ক উন্নয়নে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্থা ও সংগঠন প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। এই সংগঠনগুলোকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়: শ্রমিক সংগঠন, নিয়োগকর্তা বা মালিকদের সংগঠন এবং সরকারি ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা। শ্রমিক সংগঠন বা ট্রেড ইউনিয়ন হলো শ্রমিকদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম, যা তাদের অধিকার আদায়ের মূল কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে। ট্রেড ইউনিয়নের প্রধান ভূমিকা হলো মালিকপক্ষের সাথে যৌথ দরকষাকষির মাধ্যমে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ, বোনাস, ছুটি এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা। কোনো শ্রমিক অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত হলে বা নির্যাতনের শিকার হলে শ্রমিক সংগঠনগুলো তাকে আইনি সহায়তা প্রদান করে এবং প্রয়োজনে ধর্মঘট বা আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করে। বাংলাদেশে জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রসহ অসংখ্য খাতভিত্তিক শ্রমিক ফেডারেশন রয়েছে। তবে অনেক সময় এই সংগঠনগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সাধারণ শ্রমিকদের প্রকৃত স্বার্থ ব্যাহত হয়।

অন্যদিকে, নিয়োগকর্তা সংগঠনগুলো শিল্পমালিক ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে কাজ করে। বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন হলো ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (FBCCI)। এছাড়া তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ (BGMEA) ও বিকেএমইএ (BKMEA), এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (BEF) শ্রমবাজারে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে। এই সংগঠনগুলোর প্রধান কাজ হলো সরকারের সাথে আলোচনা করে শিল্পবান্ধব করনীতি প্রণয়ন, অবকাঠামোগত সুবিধা আদায়, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের নতুন বাজার খোঁজা এবং শ্রম অসন্তোষ নিরসনে মালিকদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করা। সাম্প্রতিক সময়ে বিজিএমইএ-এর মতো সংগঠনগুলো শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, কারখানার নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার জন্যও বিভিন্ন কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

শ্রমবাজারে শান্তি ও উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য শ্রমিক সংগঠন, নিয়োগকর্তা সংগঠন এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় সম্পর্ক (Tripartite Relationship) বিদ্যমান থাকা অত্যন্ত জরুরি। সরকার এখানে মূলত রেফারি বা মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। শ্রম অধিদপ্তর, ন্যূনতম মজুরি বোর্ড এবং শ্রম আদালতগুলোর মাধ্যমে সরকার উভয় পক্ষের বিরোধ নিষ্পত্তি করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) বাংলাদেশে সরকার, মালিক ও শ্রমিক—এই তিন পক্ষকে এক টেবিলে বসিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমমান বাস্তবায়নে কারিগরি ও নীতিগত সহায়তা প্রদান করে। যখন শ্রমিক সংগঠন এবং নিয়োগকর্তা সংগঠনের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বৈরিতা কাজ করে, তখনই শিল্পখাতে ভাঙচুর, কারখানা বন্ধ হওয়া এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। পক্ষান্তরে, উভয় পক্ষের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ, সহমর্মিতা এবং তথ্যের আদান-প্রদান থাকলে একটি সুস্থ শিল্পসম্পর্ক গড়ে ওঠে, যা শ্রমিক ও মালিক উভয়ের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনে।

শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ

একবিংশ শতাব্দীর এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার এক বিশাল রূপান্তরের মুখোমুখি, যেখানে ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা যেমন প্রবল, চ্যালেঞ্জগুলোও তেমনি জটিল। আগামী দিনের শ্রমবাজারকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করবে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন বা চতুর্থ শিল্পবিপ্লব (Fourth Industrial Revolution)। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence), রোবটিক্স, অটোমেশন, এবং ইন্টারনেট অব থিংস (IoT)-এর ব্যবহার শিল্পকারখানাগুলোতে দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কারখানায় কায়িক শ্রমের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগে যে কাজ করতে দশজন সাধারণ শ্রমিকের প্রয়োজন হতো, আধুনিক স্বয়ংক্রিয় মেশিন তা একাই করতে পারছে। এর ফলে অদক্ষ এবং স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকরা, বিশেষ করে নারী শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন। তবে এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তন কেবল কাজ কেড়েই নেবে না, বরং ডাটা সায়েন্স, সাইবার সিকিউরিটি, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং মেশিন অপারেশনের মতো খাতে লক্ষ লক্ষ নতুন ও উচ্চ আয়ের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার একমাত্র উপায় হলো বর্তমান শ্রমিকদের পুনরায় প্রশিক্ষণ দেওয়া (Reskilling) এবং নতুন প্রজন্মকে উন্নত প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা (Upskilling)।

শ্রমবাজারের ভবিষ্যতের দ্বিতীয় বড় নির্ধারক হলো পরিবেশগত পরিবর্তন ও জলবায়ু সংকট। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, অসময়ে বন্যা এবং তীব্র খরার কারণে দেশের কৃষি ও মৎস্য খাত চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে উপকূলীয় ও নদীভাঙন কবলিত এলাকার লাখ লাখ কৃষক ও জেলে তাদের চিরচেনা পেশা হারিয়ে জলবায়ু উদ্বাস্তু (Climate Refugees) হিসেবে শহরে পাড়ি জমাচ্ছে, যা শহরের অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে। একই সাথে তীব্র দাবদাহের কারণে খোলা আকাশের নিচে কাজ করা নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক ও কৃষি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও শারীরিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। তবে এই সংকটের হাত ধরেই বিশ্বজুড়ে এখন ‘সবুজ অর্থনীতি’ ও ‘সবুজ কর্মসংস্থান’ (Green Jobs)-এর ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি (যেমন- সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুবিদ্যুৎ), বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যতে বিপুল সংখ্যক কর্মীর প্রয়োজন হবে, যার জন্য আমাদের শ্রমবাজারকে এখন থেকেই প্রস্তুত করতে হবে।

ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিকীকরণের প্রসার এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি। মধ্যপ্রাচ্যের তেলনির্ভর দেশগুলো এখন তাদের অর্থনীতিকে বহুমুখী করছে (যেমন সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০), যার ফলে সেখানে আগামীতে সাধারণ নির্মাণ শ্রমিকের চেয়ে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, নার্স, আইটি বিশেষজ্ঞ এবং হসপিটালিটি খাতের দক্ষ কর্মীদের চাহিদা অনেক বেশি থাকবে। অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলো, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় বার্ধক্যজনিত কারণে কেয়ারগিভার (Caregiver) বা সেবাদানকারী, কৃষি প্রযুক্তিবিদ এবং কারখানা শ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ যদি তার প্রচলিত অদক্ষ শ্রম রপ্তানির মডেল থেকে বেরিয়ে এসে আন্তর্জাতিক মানের সনদপ্রাপ্ত দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করতে পারে, তবে রেমিট্যান্সের প্রবাহ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া গিগ ইকোনমি (Gig Economy) এবং রিমোট ওয়ার্কের (Remote Work) প্রসারের ফলে ভবিষ্যতে আমাদের তরুণদের চাকরি করার জন্য আর শারীরিকভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন হবে না; বাংলাদেশে বসেই তারা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের বহুজাতিক কোম্পানির পূর্ণকালীন কর্মী হিসেবে কাজ করতে পারবে।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শ্রমবাজার আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে আজকের শিল্প ও সেবাখাতনির্ভর অর্থনীতিতে উত্তরণের পথটি সহজ ছিল না। বেকারত্ব, দক্ষতার অভাব, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শ্রম আইনের দুর্বল প্রয়োগের মতো সমস্যাগুলো এখনো আমাদের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে। কিন্তু আমাদের রয়েছে বিপুল সংখ্যক কর্মক্ষম তরুণ প্রাণ, যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশেরই নেই। সরকার, বেসরকারি খাত, শ্রমিক সংগঠন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটায় এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তিকে সাদরে গ্রহণ করে, তবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করা সম্ভব। একটি দক্ষ, নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও আধুনিক শ্রমবাজারই পারে বাংলাদেশকে একটি উন্নত ও সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *