পরিবার মানেই আমাদের কাছে এক নিরাপদ আশ্রয়, নিঃশর্ত ভালোবাসার জায়গা। কিন্তু অনেক সময় এই পরিবারের ভেতরেই এক নীরব মানসিক যুদ্ধ চলতে থাকে। মানুষ যখন তার মনের ভেতরের পুরনো ক্ষোভ বা কষ্টগুলো না মিটিয়েই বয়সের পড়ন্ত বেলায় পৌঁছায়, তখন সেই কষ্টগুলো আর নিছক কষ্ট থাকে না। সেগুলো একসময় মানসিক অস্ত্রে পরিণত হয়।
আমাদের সামাজিক ব্যবস্থায়, বিশেষ করে যৌথ বা বর্ধিত পরিবারের প্রভাবে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়। আজ আমরা এমন একটি মানসিক অবস্থার কথা জানব, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ক্রনিক ডিফেন্সিভ ভিকটিমহুড’ (CDV), বা সোজা বাংলায়, ‘নিজেকে আজীবন ভুক্তভোগী বা নির্যাতিত ভাবার রোগ’। এই মানসিকতার কারণে একজন মানুষ কীভাবে নিজের সবচেয়ে কাছের ভাই-বোনদের দূরে ঠেলে দেয় এবং স্বেচ্ছায় বিষাক্ত আত্মীয়দের ফাঁদে পা দেয়, তা একটি বাস্তব গল্পের মাধ্যমে বোঝা যাক।
রিনার গল্প ও এক দুর্বলতার ঘূর্ণি
রিনার বয়স এখন ৫৫ বছর। সম্প্রতি তার বাবা মারা গেছেন, আর মা মারা গেছেন আরও দশ বছর আগে। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর রিনার জীবনে আর কোনো শক্ত নোঙর রইল না। রিনার নিজের জীবনটা বেশ অগোছালো। ত্রিশের কোঠায় তার বিয়ে ভেঙে যায়, এরপর কোনো কাজ বা পেশাতেই সে থিতু হতে পারেনি। তার মনের ভেতর সবসময় একটা সুপ্ত ক্ষোভ কাজ করত, যেন তার ছোট ভাই কামাল তাকে পেছনে ফেলে জীবনে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।
কামাল কিন্তু তার বোনকে ভালোবাসত। সে জানত তার বোনের মানসিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। বাবার মৃত্যুর পর কামাল চেষ্টা করল বোনকে নিজের কাছাকাছি রাখার। সে প্রস্তাব দিল রিনা যেন তার বাড়ির পাশের ছোট ঘরটিতে এসে থাকে। বাবার রেখে যাওয়া সহায়-সম্পত্তি বা জমিজমা থেকে রিনা যেন নিয়মিত একটা আয় পায়, সেই আইনি বিষয়গুলোও কামাল গুছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিল।
একজন সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের কাছে কামালের এই কাজগুলো ভাই হিসেবে দায়িত্ব পালন বা ভালোবাসা মনে হবে। কিন্তু রিনার মন কাজ করছিল সেই ‘ভিকটিম মানসিকতা’ বা CDV-এর ঘোরটোপে। তার কাছে কামালের এই সাহায্যকে মনে হলো এক ভয়ানক ষড়যন্ত্র।
কানকথার ফাঁদ
বাবা-মা না থাকার সুযোগে পরিবারের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন দৃশ্যপটে হাজির হলো। রিনার চাচা এবং বয়স্ক খালাতো ভাইরা অনেক আগে থেকেই কামালের উন্নতিতে ঈর্ষান্বিত ছিল। তারা রিনার মানসিক দুর্বলতা খুব সহজেই ধরতে পারল এবং ভাই-বোনের মাঝে ফাটল ধরানোর কাজ শুরু করে দিল।
রিনার ড্রয়িংরুমে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চা পানের ফাঁকে ফাঁকে তারা রিনার মাথায় বিষ ঢোকাতে লাগল। চাচা ফিসফিস করে বলতেন, “কামাল তোমাকে ওর বাড়ির পাশে রাখতে চাইছে কারণ ও তোমার সব খবরাখবর নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়।” খালাতো ভাই তাল মেলাতো, “দেখেছো, ও কত দ্রুত উকিল নিয়ে এসেছে? ও আসলে আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে তোমার সম্পত্তির ভাগটা মেরে দিতে চায়।”
রিনা খুব সহজেই এই কথাগুলো বিশ্বাস করল। কারণ, এই কথাগুলো তার মনের ভেতরের ‘আমিই আজীবন নির্যাতিত’ পরিচয়টাকে বড় করে তুলছিল। যদি ধরে নেওয়া হয় যে কামালই সব নষ্টের মূল, তবে রিনাকে আর নিজের জীবনের ব্যর্থতার দায় নিতে হয় না। নিজের অগোছালো জীবনের জন্য নিজেকে দোষ দেওয়ার চেয়ে, ভাইকে ভিলেন বানানো তার জন্য অনেক সহজ ছিল।
সম্পর্ক ভেঙে পড়া
খুব দ্রুতই রিনার আচরণে রোগের লক্ষণগুলো ফুটে উঠল।
আগাম প্রত্যাখ্যান
কামাল একদিন রিনার জন্য কিছু বাজার নিয়ে এল এবং ভবিষ্যতের খরচের জন্য একটি জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার কথা বলল। রিনা দরজা থেকেই চিৎকার করে উঠল। সে কামালকে তার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করল এবং কোনো কথা শোনার আগেই সাহায্য প্রত্যাখ্যান করল।
অতীত বিকৃত করা
রিনা বাইরের আত্মীয়দের কাছে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে শুরু করল। সে বলতে লাগল বাবা-মা সবসময় কামালকে বেশি ভালোবাসত, তারা সবাই মিলে রিনাকে ঠকিয়েছে। এমনকি বিশ বছর আগে তার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পেছনেও সে কামালকে দোষ দিতে লাগল।
সম্পর্কের বিভাজন
রিনার চোখে পৃথিবীটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। কামাল হয়ে গেল পুরোপুরি খারাপ বা শয়তান। আর যে চাচা বা আত্মীয়রা তার বিপদে কোনোদিন এক পয়সা দিয়ে সাহায্য করেনি, তারা শুধু তার কথায় সায় দেওয়ার কারণে হয়ে গেল পুরোপুরি ভালো বা সত্যিকারের আপনজন।
মাত্র ছয় মাসের মধ্যে রিনা চাচার বুদ্ধিতে কামালের বিরুদ্ধে সম্পত্তির আইনি বাঁটোয়ারার মামলা করে দিল এবং ভাইয়ের সাথে সব যোগাযোগ বন্ধ করে দিল। রিনা পুরোপুরি সেই ‘দুর্বলতার ঘূর্ণি’-তে আটকে গেল।
পেছনের কারণ বিশ্লেষণ
রিনার এই গল্পটি আমাদের সমাজে খুব পরিচিত একটি ঘটনা। এটি কোনো সাধারণ রাগ বা জেদ নয়, এটি একটি মানসিক রোগ। CDV বা এই দীর্ঘস্থায়ী ভিকটিম মানসিকতার পেছনের তিনটি মূল কারণ থাকে।
- সক্রিয় ভিকটিম মানসিকতা (ট্রমার প্রভাব): রিনা তার জীবনের ব্যর্থতাগুলোর জন্য একটা গভীর হীনমন্যতায় ভুগত। ৫৫ বছর বয়সে এসে নিজের ব্যর্থতার দায় নেওয়াটা মানুষের ইগোর জন্য খুব কঠিন। তাই রিনার মন নিজেকে বাঁচানোর জন্য ‘আমি একজন অসহায় ভুক্তভোগী’ পরিচয়টি আঁকড়ে ধরেছে। সে যদি কামালের সাহায্য নিত, তবে তাকে স্বীকার করতে হতো যে সে নিজে চলতে অক্ষম। তার চেয়ে নিজেকে ভিকটিম ভেবে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোটা তার মনের জন্য বেশি আরামদায়ক।
- সম্পর্কগত অমূলক সন্দেহ (প্যারানয়া): এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা কাছের মানুষদের অকারণে সন্দেহ করে। রিনা কামালকে সবচেয়ে বেশি সন্দেহ করত। কামাল যদি ভালো কিছুও করত, রিনার সন্দেহবাতিক মন সেখানে কোনো একটা ষড়যন্ত্র খুঁজে বের করত। এই সন্দেহটা আসলে একটা মানসিক দেয়াল, যা কোনো যুক্তি বা ভালোবাসাকে ভেতরে ঢুকতে দেয় না।
- সাদা-কালো দৃষ্টিভঙ্গি (স্প্লিটিং): এরা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে পারে না। এদের চোখে মানুষ হয় পুরোপুরি ফেরেশতা, নয়তো পুরোপুরি শয়তান। রিনা বুঝতে পারছিল না যে কামাল হয়তো কিছুটা ভুল করতে পারে, কিন্তু সে বোনকে ভালোবাসে। আবার চাচা হয়তো মুখে মিষ্টি কথা বলছে, কিন্তু তার নজর সম্পত্তির দিকে। এই চরমপন্থী চিন্তার কারণেই রিনা সত্যিকারের আপনজনকে দূরে ঠেলে বিষাক্ত মানুষকে কাছে টেনে নিয়েছে।
দুর্বলতার ঘূর্ণি বা ভলনারেবিলিটি ভরটেক্স
এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি ঘূর্ণির মতো কাজ করে। রিনা নিজের ভেতরের অশান্তি ঢাকতে বাইরের সুবিধাবাদী আত্মীয়দের এই ঘূর্ণিতে টেনে এনেছে। আত্মীয়রা তাকে মিথ্যা সমর্থন দিচ্ছে, আর রিনা তার বিনিময়ে তাদের সম্পত্তির কাছে যাওয়ার রাস্তা করে দিচ্ছে। আর নিজের আপন ভাইকে সে এই ঘূর্ণি থেকে নির্মমভাবে বের করে দিয়েছে।
সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, এই গল্পের শেষটা রিনার জন্য ভয়ংকর। ৫৫ বছর বয়সে রিনার দাম আত্মীয়দের কাছে শুধুই তার সম্পত্তি। যেদিন সম্পত্তির ভাগাভাগি শেষ হয়ে যাবে, সেদিন চাচার ওই মিষ্টি কথাগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। যখন রিনার বয়স আরও বাড়বে, শরীর খারাপ হবে, তখন ওই সুবিধাবাদী আত্মীয়দের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সে এক চরম একাকীত্বের মুখোমুখি হবে।
চিকিৎসা ও সমাধান
এমন একজন মানুষকে, বিশেষ করে যার বয়স পঞ্চাশ পার হয়ে গেছে, তাকে সুস্থ করে তোলা মনোবিজ্ঞানের সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কারণ এই রোগীরা কখনোই মনে করে না যে তাদের নিজেদের কোনো সমস্যা আছে। তাদের চোখে সারা পৃথিবী খারাপ, শুধু তারাই ঠিক।
সাধারণত এই রোগীরা তখনই চিকিৎসকের কাছে আসে, যখন ওই বিষাক্ত আত্মীয়রা তাদের ছেড়ে চলে যায় বা তারা জীবনে খুব বড় কোনো বিপদে পড়ে। যদি এ ধরনের রোগীর চিকিৎসা করতে হয়, তবে তা ধাপে ধাপে খুব সাবধানে করতে হয়।
প্রথম ধাপ, ঘূর্ণি থামানো এবং দূরত্ব বজায় রাখা
থেরাপি শুরু করার আগে রোগীকে ওই বিষাক্ত পরিবেশ থেকে আলাদা করতে হয়।
-
সুবিধাবাদীদের রাস্তা বন্ধ করা:রিনার ক্ষেত্রে কামালকে সবার আগে আইনিভাবে সম্পত্তির ভাগাভাগি শেষ করে ফেলতে হবে। সম্পত্তি আলাদা হয়ে গেলে চাচার আর কোনো লাভ থাকবে না, তখন তিনি এমনিতেই রিনাকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করে দেবেন।
-
পাথরের মতো নীরব থাকা (Grey Rock Method): রিনা যখন মিথ্যা অভিযোগ করে চিৎকার করবে, তখন কামালকে একেবারে নির্বিকার থাকতে হবে। কোনো রাগ দেখানো যাবে না, কষ্ট পাওয়া যাবে না, এমনকি যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টাও করা যাবে না। রোগীরা এসব ঝগড়া থেকে মানসিক শক্তি পায়। কামাল যদি পাথরের মতো নীরব থাকে, তবে রিনার এই মানসিকতা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে বাধ্য।
দ্বিতীয় ধাপ, থেরাপি বা কাউন্সেলিং শুরু করা
চিকিৎসক কখনোই রোগীকে শুরুতে বলতে পারবেন না যে সে ভুল। বললে রোগী সাথে সাথে চিকিৎসককেও শত্রু মনে করবে।
-
যুক্তি ছাড়া আবেগ মেনে নেওয়া: রিনা যদি বলে তার ভাই তাকে ঠকাচ্ছে, চিকিৎসক তখন বলবেন, “নিজের ভাইয়ের প্রতি এই অবিশ্বাস থাকাটা নিশ্চয়ই আপনার জন্য খুব কষ্টের। আসুন এই কষ্টের জায়গাটা নিয়ে কথা বলি।” এতে রোগীর মনে চিকিৎসকের প্রতি বিশ্বাস তৈরি হয়।
তৃতীয় ধাপ, ভুল ধারণাগুলো ভাঙা
বিশ্বাস তৈরি হওয়ার পর চিকিৎসক রোগীর চিন্তার ধরন বদলানোর কাজ শুরু করেন।
-
সাদা-কালো চিন্তা ভাঙা, চিকিৎসক রিনাকে বোঝাবেন যে একজন মানুষের ভেতরে ভালো-খারাপ দুটোই থাকতে পারে। চাচা মিষ্টি কথা বললেও তার অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে, আবার ভাই একটু কড়া মেজাজের হলেও সে বোনের ভালো চাইতে পারে।
-
বাস্তবতার মুখোমুখি করা, রিনা যে অমূলক সন্দেহগুলো করে, চিকিৎসক সেগুলোর স্বপক্ষে শক্ত প্রমাণ চাইবেন। ধীরে ধীরে রিনাকে বোঝানো হবে যে তার ধারণাগুলো বাস্তব নয়, কেবলই তার মনের ভয়।
চতুর্থ ধাপ, নিজের দায় নেওয়া (সবচেয়ে কঠিন কাজ)
এটাই চিকিৎসার সবচেয়ে কষ্টকর অংশ। ৫৫ বছর ধরে রিনা যে ‘ভিকটিম’ পরিচয়টা বহন করে আসছে, সেটা তাকে ছাড়তে হবে।
-
তাকে নিজের অতীত ভুলের জন্য শোক করতে হবে, কিন্তু ভাই বা বাবা-মাকে দোষ না দিয়ে।
-
তাকে নতুন করে আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে হবে। ছোট ছোট কাজের মাধ্যমে নিজের দায়িত্ব নেওয়া শিখতে হবে, যাতে তাকে ওই সুবিধাবাদী আত্মীয়দের ওপর আর নির্ভর করতে না হয়।
পঞ্চম ধাপ, বাস্তবসম্মত সম্পর্ক তৈরি করা
এতকিছুর পর ভাই-বোনের সম্পর্ক হয়তো আগের মতো গভীর ভালোবাসার হবে না, কারণ বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা জোড়া লাগানো কঠিন। কিন্তু চিকিৎসার মাধ্যমে রিনাকে অন্তত এমন একটা অবস্থায় আনা সম্ভব, যেখানে সে আর অকারণে ভাইয়ের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে না। সে নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে বাঁচতে শিখবে, বাইরের মানুষের কানকথায় প্রভাবিত না হয়ে।
উপসংহার
‘ক্রনিক ডিফেন্সিভ ভিকটিমহুড’ বা দীর্ঘস্থায়ী ভিকটিম মানসিকতা আসলে একটি আত্মঘাতী প্রক্রিয়া। এটি মানুষকে পরিস্থিতির শিকার থেকে বের করে এনে উল্টো তাকে নিজের একাকীত্বের কারিগর বানিয়ে দেয়। আমাদের সমাজে যেখানে আত্মীয়-স্বজনের প্রভাব অনেক বেশি, সেখানে রিনার মতো মানুষেরা খুব সহজেই অন্যদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়, আর এর ফলে টুকরো টুকরো হয়ে যায় একটি সুন্দর পরিবার।
এই পুরো বিষয়টি আমাদের শেখায় যে, এ ধরনের সমস্যার সমাধান সবসময় রোগীকে বোঝানোর মধ্যে থাকে না। বরং সমাধান হলো নিজেদের মানসিক শান্তি বজায় রাখার জন্য শক্ত সীমানা তৈরি করা, বিষাক্ত আত্মীয়দের প্রভাব থেকে পরিবারকে আইনিভাবে সুরক্ষিত রাখা এবং আবেগ বাদ দিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় পরিস্থিতির মোকাবিলা করা।
See the Concept on Chronic Defensive Victimhood (CDV)

