বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ বা টিভিইটি (TVET) খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ, মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হওয়ার যে লক্ষ্য বাংলাদেশ নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনে কারিগরি শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। তবে দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী হওয়া সত্ত্বেও কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ এবং টিকে থাকার হার এখনো আশানুরূপ নয়। একজন জেন্ডার ও টিভিইটি (TVET) বিশেষজ্ঞ হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি, কেবল ভর্তির কোটা বাড়িয়ে কিংবা অবকাঠামো তৈরি করে কারিগরি শিক্ষায় জেন্ডার সমতা আনা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শ্রেণিকক্ষ ও ওয়ার্কশপের ভেতরে শিক্ষাদান পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন। আর এখানেই আসে ‘জেন্ডার, রেসপনসিভ পেডাগজি’ (Gender, Responsive Pedagogy) বা সংক্ষেপে জিআরপি (GRP), এর ধারণা।
জেন্ডার, সংবেদনশীল শিক্ষণ পদ্ধতি বা জিআরপি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা, যেখানে পাঠদান, শিখন উপকরণ, শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় ছেলে ও মেয়ে উভয় শিক্ষার্থীর নির্দিষ্ট চাহিদা, অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বাস্তবতাকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারিগরি শিক্ষার প্রেক্ষাপটে এটি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে তাত্ত্বিক ক্লাসের পাশাপাশি ব্যবহারিক ওয়ার্কশপ, ল্যাবরেটরি এবং শিল্পকারখানায় ইন্টার্নশিপ বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপের (Apprenticeship) বিষয়টি জড়িত।
১. জেন্ডার, রেসপনসিভ পেডাগজি (GRP) কী এবং টিভিইটি (TVET) খাতে কেন এটি অপরিহার্য?
সাধারণ ভাষায় ‘পেডাগজি’ বলতে বোঝায় শিক্ষাদানের কৌশল বা পদ্ধতি। আর ‘জেন্ডার, রেসপনসিভ পেডাগজি’ বলতে এমন একটি শিক্ষণ, শিখন প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যা নারী, পুরুষ এবং অন্যান্য জেন্ডারের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যমান সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে এবং সেগুলো দূর করে সবার জন্য সমান ও ন্যায্য শেখার পরিবেশ নিশ্চিত করে।
অনেকেই ‘জেন্ডার ইকুয়ালিটি’ (Gender Equality বা সমতা) এবং ‘জেন্ডার ইক্যুইটি’ (Gender Equity বা ন্যায্যতা), কে এক করে ফেলেন। কারিগরি শিক্ষার একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ধরা যাক, একটি অটোমোবাইল বা ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপে ছেলে ও মেয়ে উভয় শিক্ষার্থীর জন্য একই আকারের অ্যাপ্রোন, হেলমেট ও গ্লাভস রাখা হলো এবং একই উচ্চতার ওয়ার্কবেঞ্চ দেওয়া হলো। এটি হলো বাহ্যিক সমতা। কিন্তু বাস্তবে মেয়েদের শারীরিক গঠন ও উচ্চতার কারণে সেই বড় গ্লাভস বা উঁচু টেবিল ব্যবহার করে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন হতে পারে। আবার, মেয়েদের ছোটবেলা থেকে যন্ত্রপাতি বা প্লায়ার্স, রেঞ্চ ধরার অভ্যাস আমাদের সমাজে গড়ে তোলা হয় না, যা ছেলেদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক। এখন একজন প্রশিক্ষক যদি মেয়েদের এই প্রারম্ভিক জড়তা কাটানোর জন্য বাড়তি একটু সময় ও উৎসাহ দেন এবং তাদের মাপমতো সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) নিশ্চিত করেন, তবেই সেটি হবে ‘জেন্ডার, রেসপনসিভ’ বা জেন্ডার, সংবেদনশীল পরিবেশ।
টিভিইটি খাতে জিআরপি (GRP), এর মূল স্তম্ভগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
| জিআরপি (GRP), এর ক্ষেত্র | প্রচলিত (Gender, Blind) কারিগরি শিক্ষা | জেন্ডার, সংবেদনশীল (Gender, Responsive) কারিগরি শিক্ষা |
| পাঠ্যক্রম ও উপকরণ | ছবিতে ও উদাহরণে কেবল পুরুষদের মেকানিক বা ইঞ্জিনিয়ার এবং নারীদের সেলাই বা কুকিংয়ে দেখানো হয়। | নারী ও পুরুষ উভয়কেই সকল অপ্রচলিত পেশায় (যেমন: নারী ওয়েল্ডার বা পুরুষ নার্স/শেফ) সমানভাবে উপস্থাপন করা হয়। |
| ওয়ার্কশপ ব্যবস্থাপনা | ভারী যন্ত্রপাতি চালানোর দায়িত্ব ছেলেরা পায়, আর মেয়েরা পাশে দাঁড়িয়ে দেখে বা খাতায় নোট নেয়। | রোটেশন পদ্ধতির মাধ্যমে ছেলে ও মেয়ে সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিটি মেশিন ও টুলস চালানোর সমান সুযোগ দেওয়া হয়। |
| শিক্ষকের ভাষা ও আচরণ | “এটা মেয়েদের কাজ নয়”, “মেয়েরা এত ভারী কাজ পারবে না”, এ ধরনের নিরুৎসাহিতমূলক মন্তব্য করা হয়। | জেন্ডার, নিরপেক্ষ ও উৎসাহব্যঞ্জক ভাষা ব্যবহার করা হয়, যা মেয়েদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। |
| প্রতিষ্ঠানিক পরিবেশ | মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট বা বিশ্রামাগারের অভাব এবং অনিরাপদ আবাসন ব্যবস্থা। | নিরাপদ ক্যাম্পাস, মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন (MHM) সুবিধাসহ ওয়াশরুম, ডে, কেয়ার এবং সক্রিয় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি। |
| শিল্পকারখানায় সংযুক্তি | ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্ট বা চাকরিতে মেয়েদের একা ছেড়ে দেওয়া হয়, যেখানে তারা বৈষম্যের শিকার হয়। | নিরাপদ কর্মক্ষেত্র যাচাই করে মেয়েদের পাঠানো হয় এবং নিয়মিত মেন্টরিং ও ফলো, আপ করা হয়। |
বাংলাদেশে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ (TSC), এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে (TTC) নারী শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার বাড়ানোর জন্য সরকার উপবৃত্তি ও কোটা সুবিধা চালু করেছে। কিন্তু ক্লাসরুম ও ওয়ার্কশপের পরিবেশ জেন্ডার, বান্ধব না হওয়ায় অনেক ছাত্রী মাঝপথে ঝরে পড়ছে (Dropout), অথবা পাস করার পরও সংশ্লিষ্ট পেশায় প্রবেশ করতে পারছে না। এই ঝরে পড়া রোধ করতে এবং নারীদের দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তর করতে জিআরপি বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
২. বাংলাদেশে টিভিইটি (TVET) খাতে জেন্ডার, রেসপনসিভ পেডাগজি বাস্তবায়নের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার পথে বাধাগুলো বহুমুখী। এগুলো কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং শ্রমবাজারের গভীরে প্রোথিত। নিচে এই চ্যালেঞ্জগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
২.১ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জেন্ডার স্টেরিওটাইপ (Gender Stereotypes)
আমাদের সমাজে জন্মের পর থেকেই ছেলে ও মেয়ের কাজের ক্ষেত্র আলাদা করে ফেলা হয়। ছোটবেলা থেকেই একটি ছেলেকে খেলনা গাড়ি বা যন্ত্রপাতি দেওয়া হয়, আর মেয়েকে দেওয়া হয় পুতুল বা হাঁড়ি, পাতিল। এই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার কারণে একটি বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছে যে, কারিগরি বা যন্ত্রপাতির কাজ হলো ‘পুরুষালি কাজ’।
- পেশাগত বিভাজন (Occupational Segregation): টিভিইটি খাতে দেখা যায়, মেয়েরা মূলত কম্পিউটার অফিস অ্যাপ্লিকেশন, গ্রাফিক ডিজাইন, গার্মেন্টস ও টেইলারিং, বিউটিফিকেশন বা ফুড প্রসেসিংয়ের মতো ট্রেডগুলোতে ভর্তি হচ্ছে। অন্যদিকে ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল, সিভিল কনস্ট্রাকশন, অটোমোবাইল, রেফ্রিজারেশন বা ওয়েল্ডিংয়ের মতো উচ্চ আয়ের ও চাহিদাসম্পন্ন ট্রেডগুলোতে মেয়েদের উপস্থিতি নগণ্য। পরিবার ও সমাজ মনে করে, কালি, ঝুলি মাখা বা ভারী যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া করা মেয়েদের কাজ নয়।
- অভিভাবকদের অনীহা ও বাল্যবিবাহ: অনেক অভিভাবক মনে করেন মেয়েদের কারিগরি শিক্ষায় পড়ানো মানে অর্থ ও সময়ের অপচয়, কারণ শেষ পর্যন্ত তাদের বিয়ে দিয়ে অন্যের ঘরে পাঠাতে হবে। এ ছাড়া দারিদ্র্য ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে অনেক মেয়ের পড়াশোনা চলাকালীনই বাল্যবিবাহ হয়ে যায়, যা তাদের কারিগরি শিক্ষার ইতি ঘটায়।
২.২ প্রশিক্ষক ও শিক্ষকদের সক্ষমতা এবং মানসিকতার ঘাটতি
যেকোনো শিক্ষা পদ্ধতির প্রাণ হলেন শিক্ষক বা প্রশিক্ষক। কিন্তু বাংলাদেশের টিভিইটি খাতে কর্মরত অধিকাংশ প্রশিক্ষকই প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অংশ এবং তাদের নিজেদের মধ্যেই অচেতন জেন্ডার পক্ষপাত (Unconscious Gender Bias) কাজ করে।
- প্রশিক্ষণের অভাব: কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) বা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET), এর অধীনে শিক্ষকদের যে পেডাগজিক্যাল বা মেথডোলজি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে জিআরপি (GRP), এর বিষয়টি হয় অনুপস্থিত ছিল, অথবা কেবল এক, দুই ঘণ্টার একটি তাত্ত্বিক সেশন হিসেবে রাখা হতো। ফলে কীভাবে একটি ওয়ার্কশপে জেন্ডার, সংবেদনশীল আচরণ করতে হয়, তা অনেক শিক্ষক জানেনই না।
- নারী প্রশিক্ষকের তীব্র সংকট: কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতে, বিশেষ করে অপ্রচলিত ট্রেডগুলোতে নারী প্রশিক্ষকের সংখ্যা খুবই কম। ছাত্রীদের সামনে কোনো ‘রোল মডেল’ (Role Model) না থাকায় তারা মানসিকভাবে ভরসা পায় না। অনেক সময় ছাত্রীরা তাদের শারীরিক বা ব্যক্তিগত সমস্যার কথা পুরুষ শিক্ষকদের কাছে খুলে বলতে দ্বিধাবোধ করে।
- শ্রেণিকক্ষে বৈষম্যমূলক আচরণ: অনেক শিক্ষক স্নেহের ছলে বা সুরক্ষার দোহাই দিয়ে ছাত্রীদের ব্যবহারিক কাজ থেকে দূরে রাখেন। যেমন, লেদ মেশিন বা ভারী ওয়েল্ডিং টর্চ চালানোর সময় শিক্ষক হয়তো বলেন, “তোমরা মেয়েরা দূরে দাঁড়িয়ে দেখো, ছেলেরা এটা করুক, না হলে তোমরা ব্যথা পাবে।” শিক্ষকের এই আপাত, সহানুভূতিশীল আচরণটি আসলে মেয়েদের হাতে, কলমে দক্ষতা অর্জনের পথ বন্ধ করে দেয় এবং ছেলেদের মনে এই ধারণা দেয় যে মেয়েরা কারিগরি কাজে অক্ষম।
২.৩ পাঠ্যক্রম ও শিখন উপকরণে জেন্ডার সংবেদনশীলতার অভাব
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (BTEB) সিবিটিএন্ডএ (CBT&A , Competency, Based Training and Assessment) পদ্ধতি চালু করলেও, অনেক পাঠ্যবই, কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড এবং লার্নিং ম্যাটেরিয়াল এখনো জেন্ডার, নিরপেক্ষ নয়।
- চিত্র ও ভাষার ব্যবহার: কারিগরি শিক্ষার ম্যানুয়াল বা বইগুলোর পাতা উল্টালে দেখা যায়, যেখানেই কোনো ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান বা মেশিন অপারেটরের ছবি আছে, সেখানে একজন পুরুষের ছবি দেওয়া হয়েছে। উদাহরণ দেওয়ার সময় সর্বনাম হিসেবে সর্বদা পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার করা হয়। এটি শিক্ষার্থীদের অবচেতন মনে এই বার্তা দেয় যে কারিগরি জগতটি মূলত পুরুষদের জন্য।
- জীবনদক্ষতা ও অধিকার বিষয়ের ঘাটতি: কারিগরি কারিকুলামে হার্ড স্কিল বা কারিগরি দক্ষতার ওপর যতটা জোর দেওয়া হয়, কর্মক্ষেত্রে জেন্ডার সমতা, শ্রম অধিকার, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং প্রজনন স্বাস্থ্য বা কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
২.৪ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও ওয়ার্কশপের পরিবেশ
বাংলাদেশের অধিকাংশ পুরনো পলিটেকনিক ও টেকনিক্যাল স্কুলগুলো যখন তৈরি হয়েছিল, তখন কেবল পুরুষ শিক্ষার্থীদের কথাই মাথায় রাখা হয়েছিল। ফলে অবকাঠামোগত দিক থেকে এগুলো নারীবান্ধব নয়।
- ওয়াশরুম ও স্যানিটেশন সমস্যা: অনেক প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেট নেই, অথবা থাকলেও তা তালাবদ্ধ থাকে, অপরিচ্ছন্ন থাকে কিংবা ছেলেদের টয়লেটের এত কাছে অবস্থিত যে মেয়েরা সেখানে যেতে অস্বস্তি বোধ করে। পিরিয়ড বা মাসিককালীন পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাপনার (Menstrual Hygiene Management , MHM) জন্য প্রয়োজনীয় পানি, সাবান ও স্যানিটারি ন্যাপকিন ফেলার ঢাকনাযুক্ত বিনের ব্যবস্থা খুব কম প্রতিষ্ঠানেই রয়েছে। ফলে মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে ছাত্রীরা ক্লাসে বা দীর্ঘ সময়ের ওয়ার্কশপে অনুপস্থিত থাকতে বাধ্য হয়।
- যন্ত্রপাতির ডিজাইন ও সুরক্ষা সরঞ্জাম (Ergonomics and PPE): কারিগরি ওয়ার্কশপের মেশিনারি, টেবিলের উচ্চতা এবং হ্যান্ড, টুলসগুলো সাধারণত গড়পড়তা পুরুষদের শারীরিক মাপ (Anthropometry) অনুযায়ী তৈরি। এ ছাড়া ওয়ার্কশপে যে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম বা পিপিই (যেমন: সেফটি বুট, ওভারঅল বা অ্যাপ্রোন, গ্লাভস, গগলস) সরবরাহ করা হয়, সেগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বড় সাইজের হয়। ঢিলেঢালা পোশাক বা বড় সাইজের জুতো পরে মেশিনে কাজ করা নারীদের জন্য মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে।
- আবাসন ও যাতায়াত সংকট: জেলা বা বিভাগীয় শহরের পলিটেকনিকগুলোতে দূর, দূরান্ত থেকে মেয়েরা পড়তে আসে। কিন্তু ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের হোস্টেলের আসন সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। বাইরে মেস বা বাসা ভাড়া করে থাকা মেয়েদের জন্য যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি নিরাপত্তার দিক থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা না থাকায় গণপরিবহনে যাতায়াতের সময় ছাত্রীদের প্রতিনিয়ত ভোগান্তি ও হয়রানির শিকার হতে হয়।
২.৫ জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা, বুলিং ও যৌন হয়রানি (GBV and Harassment)
কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং পরবর্তীতে ইন্টার্নশিপের সময় জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও হয়রানি মেয়েদের অংশগ্রহণের পথে একটি বড় দেয়াল।
- সহপাঠীদের দ্বারা বুলিং ও কোণঠাসা হওয়া: যেসব ক্লাসে ৩০ জন ছেলের মধ্যে মাত্র ২, ৩ জন মেয়ে থাকে, সেখানে মেয়েরা প্রায়ই একা হয়ে পড়ে। অনেক সময় ছেলে সহপাঠীরা মেয়েদের কাজ নিয়ে হাসাহাসি করে, অশালীন মন্তব্য বা বডি শেমিং করে, এবং গ্রুপ ওয়ার্কে মেয়েদের নিতে চায় না। এতে মেয়েরা মানসিকভাবে গুটিয়ে যায় এবং ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে থাকা নিরাপদ মনে করে।
- অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার অকার্যকারিতা: ২০০৯ সালে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে ৫ সদস্যবিশিষ্ট ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও অভিযোগ কমিটি’ থাকার কথা থাকলেও, অধিকাংশ টিভিইটি প্রতিষ্ঠানে এর বাস্তব প্রয়োগ নেই। কোথাও কমিটি থাকলেও শিক্ষার্থীরা তার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানে না, অথবা অভিযোগ করলে উল্টো ভিকটিম ব্লেমিং (Victim Blaming) এবং পরীক্ষায় নম্বর কমে যাওয়ার ভয়ে ছাত্রীরা চুপ থাকে।
২.৬ শ্রমবাজারের সাথে সংযোগহীনতা ও শিল্পকারখানার অসহযোগিতা
কারিগরি শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থান। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে শ্রমবাজারে প্রবেশের মুহূর্তে (School, to, Work Transition) নারীরা সবচেয়ে বড় ধাক্কা খায়।
- ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাটাচমেন্টে (Industrial Attachment) প্রতিবন্ধকতা: ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্সের শেষ পর্বে শিক্ষার্থীদের শিল্পকারখানায় বাস্তব প্রশিক্ষণ নিতে হয়। অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ মেয়েদের অ্যাটাচমেন্ট বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপের জন্য নিতে চায় না। তারা অজুহাত দেয় যে তাদের কারখানায় নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট নেই, নাইট শিফটে কাজ করার পরিবেশ নেই কিংবা মেয়েরা ভারী কাজ করতে পারবে না।
- নিয়োগ ও মজুরি বৈষম্য: একই কারিগরি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক প্রতিষ্ঠান পুরুষদের অগ্রাধিকার দেয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের কম মজুরি দেওয়া হয় এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়। মাতৃত্বকালীন ছুটি বা সন্তান লালন, পালনের দায়িত্বের ভয়ে বেসরকারি খাতের অনেক নিয়োগকর্তা দক্ষ নারী টেকনিশিয়ানদের নিয়োগ দিতে গড়িমসি করেন।
৩. টিভিইটি (TVET) খাতে জেন্ডার, রেসপনসিভ পেডাগজি বাস্তবায়নের সুপারিশমালা ও করণীয়
বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে জেন্ডার, সংবেদনশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করে গড়ে তুলতে হলে বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত উদ্যোগ নিলে চলবে না; প্রয়োজন একটি সামগ্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর (Systemic Transformation)। নিচে নীতি, নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে শ্রেণিকক্ষ ও শিল্পকারখানা পর্যন্ত করণীয় বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হলো:
৩.১ শিক্ষক ও প্রশিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন
যেহেতু জিআরপি (GRP) বাস্তবায়নের মূল কারিগর হলেন শিক্ষক, তাই সংস্কারের সূচনা হতে হবে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই।
- বাধ্যতামূলক জিআরপি (GRP) প্রশিক্ষণ: কারিগরি শিক্ষক প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয় (TTTC), ভোকেশনাল টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (VTTI) এবং বিএমইটি (BMET), এর সকল শিক্ষক প্রশিক্ষণ মডিউলে ‘জেন্ডার, রেসপনসিভ পেডাগজি’ একটি বাধ্যতামূলক ও ব্যবহারিক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কেবল তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং রোল, প্লে, কেস স্টাডি এবং শ্রেণিকক্ষ সিমুলেশনের মাধ্যমে শিক্ষকদের শেখাতে হবে কীভাবে জেন্ডার পক্ষপাতমুক্ত ক্লাস নিতে হয়।
- নারী প্রশিক্ষক ও অ্যাসেসর (Assessor) নিয়োগ বৃদ্ধি: সরকারি ও বেসরকারি টিভিইটি প্রতিষ্ঠানে নারী প্রশিক্ষক ও ব্যবস্থাপক নিয়োগে বিশেষ কোটা ও প্রণোদনা দিতে হবে। বিশেষ করে অপ্রচলিত ট্রেডে (যেমন: মেকাট্রনিক্স, অটোমোবাইল, সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল) দক্ষ নারী গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষকতা ও সিবিটিএন্ডএ (CBT&A) অ্যাসেসর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিশেষ ফেলোশিপ ও ফাস্ট, ট্র্যাক ক্যারিয়ার পাথওয়ে তৈরি করা জরুরি।
- মেন্টরশিপ ও পিয়ার লার্নিং (Peer Learning): প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞ ও জেন্ডার, সংবেদনশীল শিক্ষকদের সমন্বয়ে মেন্টরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যারা নতুন শিক্ষকদের ক্লাসরুম পর্যবেক্ষণ করবেন এবং গঠনমূলক ফিডব্যাক দেবেন।
৩.২ শ্রেণিকক্ষ ও ওয়ার্কশপের ভেতরে জিআরপি (GRP) অনুশীলনের ব্যবহারিক কৌশল
একজন প্রশিক্ষক তার প্রাত্যহিক তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাসে নিচের কৌশলগুলো প্রয়োগের মাধ্যমে একটি জেন্ডার, সংবেদনশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারেন:
- আসন বিন্যাস ও অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ: ক্লাসরুমে ছেলে ও মেয়েদের আলাদা কোণে বসিয়ে না রেখে এমনভাবে আসন বিন্যাস করতে হবে যাতে সবাই সমানভাবে বোর্ড বা প্রজেক্টর দেখতে পায় এবং শিক্ষকের মনোযোগ পায়। প্রশ্ন করার সময় কেবল হাত তোলা ছেলেদের সুযোগ না দিয়ে, পেছনের দিকে থাকা বা চুপচাপ থাকা ছাত্রীদের নাম ধরে উৎসাহ দিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিতে হবে।
- মিশ্র দল (Mixed, Gender Groups) ও দায়িত্ব আবর্তন (Role Rotation): ব্যবহারিক ওয়ার্কশপে বা প্রজেক্ট করার সময় ছেলে ও মেয়েদের সমন্বয়ে মিশ্র দল গঠন করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, দলের মধ্যে মেয়েরা যেন কেবল রিপোর্ট লেখা বা যন্ত্রপাতি পরিষ্কার করার দায়িত্বে সীমাবদ্ধ না থাকে। রোটেশন বা আবর্তন পদ্ধতির মাধ্যমে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিটি মেয়েকে দলনেতা (Team Leader) হওয়া এবং মূল মেশিন অপারেট করার দায়িত্ব দিতে হবে।
- ব্রিজিং বা ফাউন্ডেশন সাপোর্ট (Confidence Building Labs): যেহেতু সামাজিক কারণে অনেক মেয়ে জীবনে প্রথমবার কারিগরি প্রতিষ্ঠানে এসে হ্যান্ড, টুলস বা পাওয়ার, টুলস ধরে, তাই কোর্সের শুরুতে তাদের ভীতি কাটানোর জন্য অতিরিক্ত কিছু ‘হ্যান্ডস, অন ফাউন্ডেশন সেশন’ বা ল্যাব প্র্যাকটিসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে, যাতে তারা ছেলেদের সমান আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারে।
- জেন্ডার, সংবেদনশীল ভাষা ও ইতিবাচক অনুপ্রেরণা (Positive Reinforcement): ক্লাসে কোনো ধরনের জেন্ডার, ভিত্তিক কৌতুক, খোঁচা বা নিরুৎসাহিতমূলক মন্তব্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। কোনো ছাত্রী যখন একটি জটিল সার্কিট তৈরি করে বা নিখুঁত ওয়েল্ডিং জয়েন্ট দেয়, তখন সবার সামনে তার কাজের প্রশংসা করতে হবে, যা অন্য মেয়েদেরও অনুপ্রাণিত করবে।
৩.৩ জেন্ডার, সংবেদনশীল পাঠ্যক্রম ও মূল্যায়ন পদ্ধতি (Curriculum and Assessment Reform)
- পাঠ্যপুস্তক ও স্ট্যান্ডার্ডের জেন্ডার অডিট (Gender Audit): বিটিইবি (BTEB) এবং এনএসডিএ (NSDA), এর অধীনে প্রণীত সকল কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড, কারিকুলাম এবং লার্নিং ম্যাটেরিয়ালগুলোর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ‘জেন্ডার অডিট’ করতে হবে। বইয়ের পাতায় নারী ইঞ্জিনিয়ার, নারী ওয়েল্ডার, নারী প্লাম্বার এবং পুরুষ নার্স বা পুরুষ শেফের ছবি ও কেস স্টাডি যুক্ত করতে হবে, যাতে প্রচলিত স্টেরিওটাইপ ভেঙে যায়।
- সফট স্কিল ও অধিকার শিক্ষা একীভূতকরণ: কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রমে টেকনিক্যাল স্কিলের পাশাপাশি জীবনদক্ষতা (Life Skills), আত্মরক্ষা ও দরকষাকষির সক্ষমতা (Negotiation Skills), শ্রম আইন, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার (SRHR) এবং জেন্ডার সমতা বিষয়ক মডিউল বাধ্যতামূলক করতে হবে।
- পক্ষপাতমুক্ত মূল্যায়ন (Bias, Free Assessment): ব্যবহারিক পরীক্ষা বা অ্যাসেসমেন্টের সময় অনেক পরীক্ষক মেয়েদের প্রতি হয় অতিরিক্ত কঠোর হন, অথবা করুণা করে কম কঠিন কাজ দিয়ে পাস করিয়ে দেন। এই দুই প্রবণতাই ক্ষতিকর। কম্পিটেন্সি, বেইজড অ্যাসেসমেন্টে (CBT&A) ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা বা প্রসূতি মা শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার সময়সূচি ও ব্যবহারিক কাজের ক্ষেত্রে যৌক্তিক নমনীয়তা (Reasonable Accommodation) রাখার নীতিমালা থাকতে হবে।
৩.৪ নারীবান্ধব অবকাঠামো ও নিরাপদ ক্যাম্পাস গঠন
একটি প্রতিষ্ঠানের ভৌত অবকাঠামো দেখলেই বোঝা যায় প্রতিষ্ঠানটি মেয়েদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কি না।
- আধুনিক ও নিরাপদ ওয়াশরুম (WASH & MHM): প্রতিটি টিভিইটি প্রতিষ্ঠানে ছাত্রী ও নারী শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত আলো, বাতাসযুক্ত, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন আলাদা টয়লেট থাকতে হবে। সেখানে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের জন্য স্যানিটারি ন্যাপকিন ভেন্ডিং মেশিন বা ইমার্জেন্সি বক্স, সাবান, পর্যাপ্ত পানি এবং ব্যবহৃত প্যাড ফেলার জন্য ঢাকনাযুক্ত ডাস্টবিন বা ইনসিনারেটর (Incinerator) স্থাপন করতে হবে।
- নারীবান্ধব যন্ত্রপাতি ও পিপিই (Gender, Responsive PPE): ওয়ার্কশপের ক্রয় নীতিমালায় (Procurement Policy) পরিবর্তন এনে মেয়েদের শারীরিক মাপ অনুযায়ী ছোট ও মাঝারি সাইজের সেফটি বুট, গ্লাভস, হেলমেট ও অ্যাপ্রোন কেনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এ ছাড়া ওয়ার্কবেঞ্চ ও স্টুলগুলো যেন উচ্চতা পরিবর্তনযোগ্য (Adjustable) হয়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
- আবাসন, পরিবহন ও ডে, কেয়ার সেন্টার: প্রতিটি পলিটেকনিক ও টিটিসিতে সিসিটিভি ক্যামেরা ও নারী ওয়ার্ডেনসহ নিরাপদ ছাত্রীনিবাস (Hostel) তৈরি করতে হবে। ছাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাস সার্ভিস চালু করা জরুরি। এ ছাড়া বিবাহিত ছাত্রী ও নারী প্রশিক্ষকদের কথা বিবেচনা করে ক্যাম্পাসে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র (Day, Care Center) এবং ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করলে নারীদের ঝরে পড়ার হার অনেকাংশে কমে আসবে।
৩.৫ যৌন হয়রানি ও সহিংসতা প্রতিরোধে জিরো টলারেন্স নীতি
নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো পেডাগজি বা শিক্ষণ পদ্ধতিই কাজ করবে না।
- সক্রিয় অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (Grievance Redress Mechanism): হাইকোর্টের নির্দেশনা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO), এর কনভেনশন ১৯০ (কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি বিলোপ সনদ), এর আলোকে প্রতিটি টিভিইটি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও সক্রিয় করতে হবে। কমিটির সদস্যদের নাম ও ফোন নম্বর ক্যাম্পাসের দর্শনীয় স্থানে টাঙিয়ে রাখতে হবে।
- গোপনীয়তা ও সুরক্ষা: ছাত্রীরা যেন নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য ক্যাম্পাসে ‘অভিযোগ বক্স’ এবং অনলাইন বা হটলাইন ভিত্তিক গোপনীয় রিপোর্টিং সিস্টেম চালু করতে হবে। অভিযোগকারীর পরিচয় গোপন রাখা এবং তাকে যেকোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিহিংসা থেকে সুরক্ষা দেওয়া প্রতিষ্ঠান প্রধানের অন্যতম দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে।
- ছেলে শিক্ষার্থীদের সংবেদনশীল করা (Engaging Boys and Men): জেন্ডার সমতা কেবল মেয়েদের বিষয় নয়। ক্যাম্পাসে ছেলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে নিয়মিত কর্মশালা করতে হবে, যেখানে ইতিবাচক পৌরুষত্ব (Positive Masculinity), সহপাঠীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সাইবার বুলিং ও হয়রানির আইনগত পরিণতি সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
৩.৬ শিল্পকারখানার সাথে অংশীদারিত্ব এবং নিরাপদ কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি না হলে কারিগরি শিক্ষার সুফল ঘরে তোলা যাবে না।
- ইন্ডাস্ট্রি সেনসিটাইজেশন ও সমঝোতা স্মারক (MoU): টিভিইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর জব প্লেসমেন্ট সেল (Job Placement Cell) এবং ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিলগুলোকে (ISC) নিয়োগকর্তাদের সাথে নিয়মিত সংলাপ করতে হবে। যেসব কারখানায় ছাত্রীদের ইন্টার্নশিপ বা অ্যাপ্রেন্টিসশিপে পাঠানো হবে, তাদের সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (MoU) নারী প্রশিক্ষণার্থীদের নিরাপত্তা, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ এবং উপযুক্ত কর্মপরিবেশের শর্তাবলি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
- সরকারি প্রণোদনা ও স্বীকৃতি: যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান অপ্রচলিত পেশায় নির্দিষ্ট শতাংশ নারী টেকনিশিয়ান বা প্রকৌশলী নিয়োগ দেবে এবং নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করবে, সরকার তাদের কর রেয়াত (Tax Rebate), সহজ শর্তে ঋণ বা ‘জেন্ডার, চ্যাম্পিয়ন এমপ্লয়ার’ অ্যাওয়ার্ডের মাধ্যমে উৎসাহিত করতে পারে।
- নারী উদ্যোক্তা তৈরি ও আর্থিক সংযোগ: যেসব নারী পারিবারিক বা সামাজিক কারণে দূরবর্তী কারখানায় চাকরি করতে পারছেন না, তাদের কারিগরি দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (SME) হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এজন্য টিভিইটি কারিকুলামে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ব্যাংক ও ক্ষুদ্রঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে সংযোগ স্থাপনের কৌশল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৩.৭ পরিবার ও কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা এবং ব্র্যান্ডিং
- সফল নারীদের গল্প প্রচার (Role Modeling): কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে যেসব নারী আজ সফল ইঞ্জিনিয়ার, বিমানের মেকানিক, অটোমোবাইল টেকনিশিয়ান বা সফল উদ্যোক্তা হয়েছেন, তাদের জীবনগল্প গণমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া এবং স্কুল, কলেজের ক্যারিয়ার মেলায় ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। এই সফল নারীদের টিভিইটি প্রতিষ্ঠানে অতিথি বক্তা (Guest Speaker) হিসেবে নিয়ে আসলে ছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের মনোবল বহুগুণ বেড়ে যাবে।
- অভিভাবক ও কমিউনিটি অ্যাঙ্গেজমেন্ট: স্থানীয় পর্যায়ে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজগুলোকে বছরে অন্তত দুইবার ‘ওপেন ডে’ (Open Day) এবং অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করতে হবে। সেখানে মা, বাবা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ধর্মীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে দেখাতে হবে যে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কতটা নিরাপদ এবং এখান থেকে পাস করে মেয়েরা কীভাবে সম্মানজনক জীবিকা অর্জন করছে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন কাঠামো (Action Plan Matrix)
জেন্ডার, রেসপনসিভ পেডাগজি (GRP) বাস্তবায়নের কাজটি যাতে কেবল কাগজে, কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, সে জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দায়িত্ব ও জবাবদিহিতা সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন। নিচে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা ছক দেওয়া হলো:
| করণীয় ক্ষেত্র | সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম | দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা / অংশীজন | প্রত্যাশিত ফলাফল (Impact) |
| নীতি ও অর্থায়ন | টিভিইটি প্রতিষ্ঠানে জেন্ডার, বাজেটিং (Gender Responsive Budgeting) চালু করা এবং ছাত্রীদের উপবৃত্তি ও নিরাপদ হোস্টেল খাতে বরাদ্দ বাড়ানো। | কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ (TMED), DTE, BMET। | মেয়েদের ভর্তির হার বৃদ্ধি পাবে এবং আর্থিক কারণে ঝরে পড়া বন্ধ হবে। |
| শিক্ষক প্রশিক্ষণ | সকল টিভিইটি প্রশিক্ষকের জন্য জিআরপি (GRP) প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা এবং বার্ষিক কর্মমূল্যায়নে (ACR) জেন্ডার, সংবেদনশীলতার সূচক যুক্ত করা। | TTTC, VTTI, BTEB, NSDA। | শ্রেণিকক্ষ ও ওয়ার্কশপে বৈষম্যহীন, উৎসাহব্যঞ্জক ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে। |
| প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা | নারীবান্ধব ওয়াশরুম (MHM সহ), সাইজ অনুযায়ী পিপিই (PPE), ডে, কেয়ার এবং সক্রিয় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নিশ্চিত করা। | পলিটেকনিক ও টিটিসির অধ্যক্ষ এবং ইনস্টিটিউট ম্যানেজমেন্ট কমিটি (IMC)। | ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের উপস্থিতি ও নিরাপত্তা বাড়বে এবং ব্যবহারিক কাজে তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। |
| শিল্প, সংযোগ ও কর্মসংস্থান | নিরাপদ অ্যাপ্রেন্টিসশিপ নিশ্চিত করা, নিয়োগে জেন্ডার বৈষম্য দূর করা এবং কর্মক্ষেত্রে মেন্টরিং ও ডে, কেয়ার সুবিধা চালু করা। | ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিল (ISC), ব্যবসায়িক সংগঠন (FBCCI, BGMEA) ও বেসরকারি খাত। | অপ্রচলিত ও উচ্চ আয়ের কারিগরি পেশায় নারীদের কর্মসংস্থান ও টিকে থাকার হার (Retention Rate) বৃদ্ধি পাবে। |
৫. চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (4IR) ও সবুজ অর্থনীতিতে (Green TVET) নারীর সম্ভাবনা এবং জিআরপি
ভবিষ্যতের শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বা অটোমেশন, রোবোটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI), আইওটি (IoT) এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তি বা ‘গ্রিন টিভিইটি’ (Green TVET), এর বিস্তার কারিগরি শিক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। প্রচলিত কারিগরি কাজে পেশিশক্তির যে অজুহাত দেখিয়ে নারীদের দূরে রাখা হতো, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কারিগরি কাজে সেই অজুহাত আর খাটে না। কারণ এখন ভারী মেশিন চালানোর জন্য পেশিশক্তির চেয়ে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং, সেন্সর কন্ট্রোল এবং সূক্ষ্ম কারিগরি জ্ঞানের প্রয়োজন বেশি।
এই সুযোগটি কাজে লাগাতে হলে আমাদের টিভিইটি খাতে এখনই জিআরপি (GRP), এর মাধ্যমে মেয়েদের স্টেম (STEM , Science, Technology, Engineering, and Mathematics) এবং আধুনিক প্রযুক্তিমুখী ট্রেডগুলোতে প্রস্তুত করতে হবে। সোলার প্যানেল ইন্সটলেশন ও মেইনটেন্যান্স, ইলেকট্রিক ভেহিকল (EV) সার্ভিসিং, ইন্ডাস্ট্রিয়াল অটোমেশন, থ্রিডি প্রিন্টিং এবং সাইবার সিকিউরিটির মতো উদীয়মান খাতগুলোতে মেয়েদেরকে সমানতালে প্রশিক্ষণ দিতে পারলে বাংলাদেশ তার ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক সুবিধার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে পারবে।
জেন্ডার, রেসপনসিভ পেডাগজি (GRP) কোনো দাতব্য বা কেবল নারীদের প্রতি বিশেষ অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি মানসম্মত ও আধুনিক কারিগরি শিক্ষার একটি মৌলিক শর্ত। একজন দক্ষ প্রশিক্ষক যখন তার শ্রেণিকক্ষে ও ওয়ার্কশপে জিআরপি প্রয়োগ করেন, তখন কেবল মেয়েরাই উপকৃত হয় না, বরং ছেলে শিক্ষার্থীরাও একটি সহযোগিতাপূর্ণ ও পেশাদার কর্মসংস্কৃতি শিখতে পারে, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। সরকারি নীতিমালা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, শিক্ষকদের আন্তরিকতা, শিল্পকারখানার সহযোগিতা এবং পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গির ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের টিভিইটি খাতকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ দক্ষতা উন্নয়ন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব।
