প্রতিটি বাবা-মায়ের কাছে তার সন্তান এক পৃথিবীর সমান। কিন্তু যখন সেই সন্তানের জগতটা আমাদের চেনা ছকের চেয়ে একটু আলাদা হয়, তখন বাবা-মায়েদের মনে জন্ম নেয় এক সীমাহীন শঙ্কা আর দুশ্চিন্তা। আমার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা অটিস্টিক শিশুদের বাবা-মায়েরা সবসময় এক তীব্র মানসিক চাপ বা টেনশনে থাকেন। তারা সারাক্ষণ ভাবেন, “এখন কী করব?”, “কেন আমার সন্তান এমন করছে?”, “কীভাবে ওকে শান্ত করব?”
আমি দিনের পর দিন এমন অনেক বাবা-মায়েদের দেখেছি যারা চরম অসহায়ত্ব নিয়ে বাচ্চা নিয়ে ছুটাছুটি করে। কেউ কাঁদেন সন্তানের চোখের ভাষা না বুঝতে পেরে । কেউবা লোকলজ্জার ভয়ে সন্তানকে চার দেয়ালে বন্দি করে রাখেন । আবার কেউ সন্তানের অকারণে হাসি বা কান্নার মানে খুঁজতে গিয়ে নিজেরাই হতাশায় ডুবে যান । এই বাবা-মায়েরা আসলে ক্লান্ত; তারা সন্তানের জন্য লড়তে গিয়ে এক পর্যায়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং বুঝতে পারেন না তাদের ঠিক কী করা উচিত ।
এই বইটি লেখার মূল কারণ হলো সেই ক্লান্ত এবং দিশেহারা বাবা-মায়েদের হাতে একটি দিকনির্দেশক কম্পাস তুলে দেওয়া । আমি তাদের বোঝাতে চেয়েছি যে, এই শিশুরা আসলে ‘নষ্ট’ বা ‘অসম্পূর্ণ’ নয়, বরং তাদের জগতটা আমাদের চেয়ে আলাদা । আমরা বড়রা সবসময় চাই আমাদের নিয়মে ওরা চলুক, কিন্তু ওদের জগতে আগে অতিথি না হয়ে জোর করে ওদেরকে আমাদের জগতে টেনে আনা সম্ভব নয় । ওদের প্রতিটি অদ্ভুত আচরণের পেছনেই একটি কারণ থাকে, সেটা হোক নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য লাফালাফি করা, কিংবা পেটের ভেতরের না-বলা ব্যথার কারণে খিটখিটে হওয়া।
বাবা-মায়েদের টেনশন আর হাহাকারগুলো যেন দূর হয় এবং দীর্ঘশ্বাসের ভার কমে গিয়ে সেখানে ভালোবাসার স্বস্তি ফিরে আসে, সেই উদ্দেশ্যেই এই ‘অন্যরকম রোদ্দুর এবং একটি নীল বোতাম’ বইটির জন্ম । একটি বেসুরো তারেও যে চমৎকার রাগিনী বাজানো সম্ভব, এই বইটি সেই চেষ্টারই একটি অংশ ।
আসুন, ওদের জগতটাকে একটু ওদের চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করি।

