ভূমিকা
যেকোনো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং বেকারত্ব দূরীকরণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ (Technical and Vocational Education and Training – TVET) একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ তরুণ ও কর্মক্ষম, সেখানে এই “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” (Demographic Dividend) বা জনমিতিক লভ্যাংশকে কাজে লাগাতে কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। বাংলাদেশ সরকারের ‘রূপকল্প ২০৪১’ (Vision 2041) এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় ভর্তির হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, যা বর্তমানে প্রায় ১৪ শতাংশের কাছাকাছি।
তবে, এই লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা খাত নানাবিধ প্রশাসনিক, কাঠামোগত এবং ব্যবস্থাপনাগত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। বিশেষ করে, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের (Project) যথাযথ বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রত্যাশিত ফলাফল অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশের বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রমের প্রধান প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জসমূহ এবং প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বা প্রকল্প ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামো
বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামো অত্যন্ত বিস্তৃত হলেও তা বেশ খণ্ডিত। মূলত একাধিক মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মাধ্যমে দেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মধ্যে প্রধান সংস্থাগুলো হলো:
-
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ (TMED): শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কারিগরি শিক্ষার নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম পরিচালনা করে।
-
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE): দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং অন্যান্য সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক ব্যবস্থাপনা দেখভাল করে।
-
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (BTEB): কারিকুলাম প্রণয়ন, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষা গ্রহণ এবং সনদ প্রদানের দায়িত্ব পালন করে।
-
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET): প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (TTC) সমূহ পরিচালনা করে।
-
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর (DYD): যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বল্পমেয়াদী বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করে।
এছাড়াও মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ প্রায় ২০টিরও বেশি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সাথে জড়িত।
প্রশাসনিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জসমূহ (Administrative Challenges)
বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা খাতের সম্প্রসারণ ঘটলেও গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে বেশ কিছু প্রকট বাধা রয়েছে। নিচে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হলো:
নীতিগত সমন্বয়হীনতা ও বহু-বিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ
কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রম একাধিক মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় এদের মধ্যে মারাত্মক সমন্বয়হীনতা দেখা যায়। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) গঠিত হলেও, বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব প্রশাসনিক নিয়ম ও কার্যপ্রণালী থাকায় একটি একক ছাতার নিচে (Umbrella Framework) সবাইকে নিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সম্পদের দ্বৈত ব্যবহার (Duplication of resources) হচ্ছে এবং নীতি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হচ্ছে।
অর্থায়ন ও বাজেটের সীমাবদ্ধতা
যেকোনো সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি শিক্ষা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কারণ এতে আধুনিক যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল (Consumables) এবং বিশেষায়িত ল্যাবরেটরির প্রয়োজন হয়।
-
সরকারি বাজেটে কারিগরি শিক্ষার জন্য যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
-
বেসরকারি পলিটেকনিক বা ভোকেশনাল স্কুলগুলোর ক্ষেত্রে এই আর্থিক সংকট আরও তীব্র।
-
বাজেটের অভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত তাদের ল্যাবরেটরি ও যন্ত্রপাতি আপডেট করতে পারে না, ফলে শিক্ষার্থীরা সেকেলে প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।
শিল্পের চাহিদার সাথে কারিকুলামের ব্যবধান (Skills Mismatch)
প্রশাসনিক পর্যায়ে অন্যতম বড় ব্যর্থতা হলো শিল্প খাতের (Industry) বাস্তব চাহিদার সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কারিকুলামের সমন্বয় করতে না পারা।
-
কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই “সাপ্লাই-ড্রিভেন” (Supply-driven) বা সরবরাহ-নির্ভর পদ্ধতিতে কাজ করে, যেখানে তাদের উচিত “ডিমান্ড-ড্রিভেন” (Demand-driven) বা চাহিদা-নির্ভর হওয়া।
-
ইন্ডাস্ট্রি এবং একাডেমিয়ার মধ্যে কার্যকর সংযোগের (Industry-Academia Linkage) অভাবে শিক্ষার্থীরা যা শিখছে, কর্মক্ষেত্রে তার প্রয়োগ থাকছে না। ফলে একদিকে শিল্পকারখানাগুলো দক্ষ কর্মীর অভাবে ভুগছে, অন্যদিকে কারিগরি শিক্ষার্থীরা বেকার বসে থাকছে।
দক্ষ শিক্ষক সংকট এবং প্রশাসনিক অসহযোগিতা
মানসম্মত কারিগরি শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলেন দক্ষ প্রশিক্ষক। কিন্তু বাংলাদেশে যোগ্য ও শিল্প-অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষকের ব্যাপক অভাব রয়েছে।
-
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর শিক্ষকের পদ শূন্য পড়ে থাকে।
-
যেসব শিক্ষক রয়েছেন, তাদের নিয়মিত পেশাগত উন্নয়নের (Training of Trainers – ToT) জন্য পর্যাপ্ত প্রশাসনিক উদ্যোগ নেই।
-
নতুন প্রবর্তিত কম্পিটেন্সি বেইজড ট্রেনিং (CBT) পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করার জন্য যে পরিমাণ সার্টিফাইড অ্যাসেসর (Assessor) প্রয়োজন, তা এখনো তৈরি হয়নি।
আধুনিক অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতির সংকট
কারিগরি শিক্ষা মানেই হলো হাতে-কলমে (Hands-on) শিক্ষা। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অনেক ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞান ও ট্রেড ল্যাবরেটরি নেই।
-
ব্যবহারিক ক্লাস পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক শিক্ষক কেবল তাত্ত্বিক (Theoretical) ক্লাস নিয়ে কোর্স শেষ করতে বাধ্য হন।
-
যেসব যন্ত্রপাতি আছে, তার অনেকগুলোই অকেজো বা মেরামত করার মতো প্রশাসনিক ফান্ড প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে উল্লেখযোগ্য।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও জেন্ডার বৈষম্য
কারিগরি শিক্ষাকে সমাজে এখনো “দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা” হিসেবে দেখা হয়। মেধাবী শিক্ষার্থীরা সাধারণত কারিগরি শিক্ষায় আসতে চায় না। প্রশাসনিকভাবে এই নেতিবাচক ধারণা দূর করার জন্য যথেষ্ট জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির অভাব রয়েছে।
নারীদের ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ আরও ভয়াবহ। সামাজিক রক্ষণশীলতা, নিরাপত্তা সংকট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীবান্ধব পরিবেশের অভাব (যেমন- পৃথক ওয়াশরুম বা কমনরুম না থাকা) এবং যাতায়াতের অসুবিধার কারণে কারিগরি শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত হতাশাজনক।
টিভেট (TVET) সেক্টরে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট (Project Management in TVET)
কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং কাঠামোগত সংস্কারের জন্য বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার (যেমন- বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইএলও) সহায়তায় বেশ কিছু মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ASSET (Accelerating and Strengthening Skills for Economic Transformation) প্রজেক্ট এবং SICIP (Skills for Industry Competitiveness and Innovation Program) প্রজেক্ট ইত্যাদি। তবে এই মেগা প্রজেক্টগুলোর ব্যবস্থাপনায় (Project Management) বেশ কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জ লক্ষ্য করা যায়।
প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের স্তরভিত্তিক চ্যালেঞ্জ
| প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ধাপ | বিদ্যমান প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ | ফলাফল / প্রভাব |
| উদ্যোগ ও পরিকল্পনা (Initiation & Planning) | সঠিক নিডস অ্যাসেসমেন্ট (Needs Assessment) না করা; বিদেশি কনসালটেন্টদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। | স্থানীয় প্রেক্ষাপটের সাথে প্রকল্পের অমিল; অবাস্তব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ। |
| ক্রয় ও সংগ্রহ (Procurement) | সরকারি ক্রয় বিধিমালার (PPA/PPR) আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা; টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জটিলতা। | আধুনিক যন্ত্রপাতি আসতে আসতে তা প্রযুক্তির দিক থেকে পুরনো (Obsolete) হয়ে যায়। |
| বাস্তবায়ন (Execution) | ফান্ডের ছাড় পেতে বিলম্ব; বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার (BTEB, DTE, Industry) এর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। | প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা পার হয়ে যাওয়া এবং খরচ বৃদ্ধি (Cost Overrun)। |
| মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন (M&E) | গুণগত মান যাচাইয়ের চেয়ে কেবল ডেটা বা সংখ্যা (Quantification) পূরণের দিকে নজর দেওয়া; CAMS এর দুর্বল বাস্তবায়ন। | প্রশিক্ষণের প্রকৃত মান ও স্নাতকদের কর্মসংস্থানের সঠিক চিত্র উঠে আসে না। |
দাতা সংস্থার ওপর নির্ভরতা ও প্রকল্পের স্থায়িত্ব (Project Sustainability)
কারিগরি শিক্ষায় প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো প্রকল্পের স্থায়িত্ব বা সাস্টেইনেবিলিটি। বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলো চলাকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ জাঁকজমকভাবে চলে, প্রশিক্ষণার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হয় এবং শিক্ষকদের বিশেষ ভাতা থাকে। কিন্তু প্রকল্প শেষ হওয়ার সাথে সাথেই অনুদান বন্ধ হয়ে যায় এবং সরকার সেই বিপুল পরিচালনা ব্যয় বহন করতে হিমশিম খায়। প্রশাসনিকভাবে এই “এক্সিট স্ট্র্যাটেজি” (Exit Strategy) বা প্রকল্প-পরবর্তী পরিচালনার রূপরেখা আগে থেকে নির্ধারণ না করার কারণে অনেক ভালো উদ্যোগ মাঝপথে মুখ থুবড়ে পড়ে।
মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা (Quality Assurance Management System – CAMS)
প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো মান নিশ্চিতকরণ। প্রথাগত কারিগরি শিক্ষাকে যখন সিবিটি (CBT – Competency Based Training) মডেলে রূপান্তর করার প্রজেক্ট নেওয়া হয়, তখন এর জন্য ব্যাপক ডকুমেন্টেশন, মডিউল তৈরি এবং অ্যাসেসমেন্টের প্রয়োজন হয়। প্রশাসনিক জনবলের অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক চাপের কারণে এই গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াটি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে করণীয়
বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষার বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে বিদ্যমান প্রশাসনিক ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে হবে। এর জন্য নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
১. একক প্রশাসনিক ছাতা তৈরি: কারিগরি শিক্ষার সাথে জড়িত সকল মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কার্যক্রমকে একটি সুনির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের (যেমন- কার্যকর NSDA) অধীনে নিয়ে আসতে হবে, যাতে কাজের দ্বৈততা পরিহার করা যায়।
২. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP): শিল্পের চাহিদাপূরণে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় শিল্পকারখানার মধ্যে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব গড়তে হবে। পাঠ্যক্রম প্রণয়ন থেকে শুরু করে শিক্ষানবিশ (Apprenticeship) প্রোগ্রাম পরিচালনায় ইন্ডাস্ট্রিকে সরাসরি যুক্ত করতে হবে।
৩. প্রকিউরমেন্ট নীতিমালার সংস্কার: কারিগরি শিক্ষার যন্ত্রপাতি দ্রুত পরিবর্তনশীল। তাই প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে প্রচলিত ধীরগতির টেন্ডার প্রক্রিয়ার সংস্কার করে “ফাস্ট-ট্র্যাক” বা দ্রুতগতির প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৪. মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন (M&E) জোরদারকরণ: প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় নিবিড় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। ASSET বা SICIP-এর মতো মেগা প্রজেক্টগুলোতে শুধু কতজন পাশ করলো তা না দেখে, কতজন শিল্প খাতে চাকরি পেলো, তার ভিত্তিতে (Tracer Study) প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করতে হবে।
৫. শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ: প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে দ্রুততম সময়ে শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ওপর তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের (ToT) ব্যবস্থা করতে হবে।
৬. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: কারিগরি শিক্ষা সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রচারণা (Public Awareness Campaigns) চালাতে হবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পায়নের যে ধারা চলমান, তাকে টেকসই রূপ দিতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। গার্মেন্টস শিল্প, চামড়া, হালকা প্রকৌশল (Light Engineering), ফার্মাসিউটিক্যালস এবং আইটি খাতের প্রসার প্রমাণ করে যে দেশে দক্ষ জনবলের বিশাল চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এই চাহিদাপূরণের পথে কারিগরি শিক্ষার বর্তমান প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ত্রুটিগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, কারিকুলামের যুগোপযোগীকরণ এবং শিল্প-একাডেমিয়ার সংযোগ— এগুলো শুধু কাগজে-কলমে বা প্রকল্পের দলিলে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একটি দক্ষ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামোর মাধ্যমেই কেবল ASSET এবং SICIP-এর মতো উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়ন সম্ভব। বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকল স্টেকহোল্ডার যদি সমন্বিতভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে পারে, তবে কারিগরি শিক্ষাই হয়ে উঠবে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রধান হাতিয়ার।