বলা না-বলার ব্যাকরণ

বলা না-বলার ব্যাকরণ

লেখকের কথা: বলা না-বলার ব্যাকরণ

মানুষের মন এবং আচরণের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণার পথে হেঁটে আমি প্রতিনিয়ত একটি অদ্ভুত সত্যের মুখোমুখি হয়েছি, মানুষ সবচেয়ে বেশি নিঃসঙ্গ বোধ করে তার সবচেয়ে কাছের মানুষটির পাশেই। দীর্ঘদিনের পেশাগত অভিজ্ঞতা ও আচরণগত বিশ্লেষণের জায়গা থেকে দেখেছি, বিয়ে মানে কেবল দুটো মানুষের এক হওয়া নয়, বরং এটি দুটো ভিন্ন পৃথিবী, ভিন্ন স্বপ্ন আর কিছু অগোছালো প্রত্যাশার এক হয়ে যাওয়ার নিরন্তর চেষ্টা

আমাদের সমাজে বিবাহিত জীবন নিয়ে অনেক রূপকথা প্রচলিত থাকলেও, বাস্তবতার ক্যানভাসে প্রায়শই জমে থাকে না-বলা কথার ধুলো। কখনো স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তৈরি হয় ‘ভালনারেবিলিটি ভরটেক্স’ (Vulnerability Vortex), কখনোবা ‘মাইক্রো-চিটিং’ বা আর্থিক অস্বচ্ছতার কারণে ভেঙে পড়ে বিশ্বাসের ভিত। এই বইয়ের প্রতিটি গল্প,হোক তা আসিফ-রিতুর ‘অ্যাকটিভ লিসেনিং’-এর অভাব, শফিক-রূপার ‘অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল’-এর ভিন্নতা, কিংবা হাসান-মিতার ভেঙে যাওয়া আয়নার মতো সংসার, আমাদেরই চারপাশের চিরচেনা জীবনের প্রতিচ্ছবি

বলা না-বলার ব্যাকরণ: দাম্পত্যে মানসিক দূরত্ব ও কাছে ফেরার পথ বইটি কোনো তাত্ত্বিক গবেষণাপত্র নয়। এটি আমার ডায়েরির পাতা থেকে নেওয়া, যেখানে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের দাম্পত্যের মনস্তত্ত্ব উঠে এসেছে। এখানে আমি চেষ্টা করেছি সাইকোলজির জটিল ধারণাগুলোকে, যেমন অভিযোগের ক্ষেত্রে ‘ইউ-স্টেটমেন্ট’-এর বদলে ‘আই-স্টেটমেন্ট’ ব্যবহার, গ্যারি চ্যাপম্যানের ‘ফাইভ লাভ ল্যাঙ্গুয়েজেস’, কিংবা বিশ্বাস ভাঙার পর জাপানি ‘কিনসুকুরোই’ (Kintsugi) শিল্পের মতো সম্পর্ক জোড়া লাগানোর দর্শন, খুব সহজভাবে প্রাত্যহিক জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধানে তুলে ধরতে

সম্পর্ক হলো ব্যালকনিতে রাখা একটি টবের গাছের মতো, যাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভালোবাসার জল দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়; একদিনে এক বালতি পানি ঢেলে দিলে তা বাঁচে না। দাম্পত্য সম্পর্ক একটি চলমান প্রক্রিয়া, কোনো স্থির গন্তব্য নয়। রুটিন আর দায়িত্বের চাপে যখন সম্পর্ক থেকে নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত সময় বা ‘কোয়ালিটি টাইম’ হারিয়ে যায়, তখন দুটো মানুষ খুব দ্রুত একে অপরের কাছে অচেনা হয়ে ওঠে

আমি আশা করি, এই বইটি সেই হারিয়ে যাওয়া সময় এবং অনুভূতির জলসিঞ্চনের বিদ্যাটুকু নতুন করে শিখতে সাহায্য করবে। দাম্পত্যের যে না-বলা কথাগুলো এবং না-বোঝা আবেগগুলো যুগলদের মাঝে দূরত্বের দেয়াল তৈরি করে, এই বইয়ের পাতাগুলো সেই দেয়াল ভেঙে পুনরায় কাছে ফেরার পথ দেখাবে।

খাঁন মোহাম্মাদ মাহমুদ হাসান

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *