আনিসের অদৃশ্য দেয়াল

আনিসের অদৃশ্য দেয়াল

মানুষের আচরণ এবং অবচেতন মন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি সবসময়ই একটি বিষয়ের প্রতি কৌতূহলী ছিলাম—কীভাবে দুজন মানুষ সম্পূর্ণ ভালোবেসে একটি সম্পর্ক শুরু করার পরও ধীরে ধীরে তাদের মাঝে মনস্তাত্ত্বিক আত্মরক্ষার (psychological defense mechanism) এক অদৃশ্য দেয়াল গড়ে তোলে। আমার স্ত্রী, যিনি পেশায় একজন থেরাপিস্ট, তার সাথে দাম্পত্য মনস্তত্ত্ব এবং মানুষের আচরণের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েই মূলত ‘অদৃশ্য দেয়াল’ উপন্যাসের বীজ বোনা হয়।

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আনিস এবং চৈতি কোনো রূপকথার চরিত্র নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কপালে গাঢ় নীল টিপ পরা চৈতিকে দেখে সাধারণ মধ্যবিত্ত আনিসের জগত থমকে গিয়েছিল। তারা ভেবেছিল তাদের সংসার হবে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর সংসার, যেখানে কোনো ঝগড়া বা ক্লান্তি থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা এবং দায়িত্বের চাপে তাদের সেই প্রেম কীভাবে একটু একটু করে রোজকার বাজারের ফর্দের নিচে চাপা পড়ে যায়, এটি তারই গল্প

মানুষ যখন খুব অসহায় আর অপমানজনক অবস্থায় পড়ে, তখন সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য অবচেতনভাবেই মনের ভেতর একধরনের দেয়াল তৈরি করে। আনিস আর চৈতির মাঝেও সেই দেয়াল তৈরি হয়েছিল। বিয়ের দশ বছর পর, একই ছাদের নিচে এবং একই ডাইনিং টেবিলে বসেও তারা দুজন হয়ে গিয়েছিল কয়েক হাজার মাইল দূরের বাসিন্দা। তাদের এই বোবা দূরত্ব এবং মৃত্যুশীতল নীরবতা কীভাবে তাদের সন্তান অয়ন ও রুবার মতো কচি শিশুদের মনস্তত্ত্বের ওপর পাহাড়ের মতো চাপ তৈরি করে, তা আমি আচরণগত মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। দশ বছরের অয়ন কীভাবে বাবা-মায়ের মাঝে একটি নীরব রাডার বা শান্তিদূতের ভূমিকা নেয়, তা যেকোনো সংবেদনশীল মানুষকে গভীরভাবে ভাবাবে

ইগো, জেদ এবং তৃতীয় পক্ষের কানকথায় তাদের সম্পর্ক যখন ডিভোর্সের খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়ায়, তখন তারা মনস্তাত্ত্বিক ‘দুর্বলতার ঘূর্ণিপাক’ বা ‘ভালনারেবিলিটি ভরটেক্স’-এর মুখোমুখি হয়। ঢাকার ১২০০ স্কয়ার ফিটের দমবন্ধ করা ফ্ল্যাট ছেড়ে কক্সবাজারের সমুদ্রের বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে তারা যখন নিজেদের মুখোমুখি হয়, তখন তাদের জমে থাকা জেদ এবং অহংকার ধুলোর মতো উড়ে যায়

একজন লেখক ও গবেষক হিসেবে আমার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের অবচেতন মনের প্যাটার্ন এবং ইমোশনাল রেগুলেশনের অভাব কীভাবে একটি সুন্দর সম্পর্ককে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়, তা ব্যবচ্ছেদ করা। আশা করি, আনিস আর চৈতির এই গল্প আপনাদের নিজেদের জীবনের আয়না হয়ে ধরা দেবে এবং অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের চারপাশে গড়ে ওঠা অদৃশ্য দেয়ালগুলো ভাঙতে সাহায্য করবে।

খান মোহাম্মদ মাহমুদ হাসান

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *